
কোথাও যেতে হলে কাঁধে করে নিতে হতো, একটু খেলতে চাইলেও মা-বাবার কোলে ভর করতে হতো। ৮ বছরের শিশু জাকিয়া খাতুনের কাছে জীবন মানে ছিল ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত গিয়েই থেমে যাওয়া। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার দু’পায়ের গতি কেড়ে নিয়েছিল। অথচ তারও ছিল বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা, অন্য সবার মতো স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন।
কিন্তু জীবন বদলে গেল মাত্র একদিনে—একটি হুইলচেয়ারের ছোঁয়ায়।
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার ছনধরা ইউনিয়নের মেরীগাই গ্রামের দিনমজুর আব্দুল জলিলের মেয়ে জাকিয়া। অসচ্ছল পরিবার, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতেই যেখানে হিমশিম, সেখানে একটি হুইলচেয়ারের জন্য খরচ করাটা যেন অসম্ভবের নামান্তর। তবু বাবার মন মানতে চায়নি। শেষ ভরসা হিসেবে গত ১৮ জুন তিনি আবেদন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া ইসলাম সীমার কাছে।
মানবিক এই আবেদন পড়ে হৃদয় স্পর্শ করে ইউএনওর। তিনি কোনো দেরি না করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পরদিন, ১৯ জুন বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাকিয়াকে তুলে দেওয়া হয় একটি নতুন হুইলচেয়ার। আর সেই মুহূর্ত থেকেই যেন বদলে যেতে থাকে একটি শিশু ও তার পরিবারের ভাগ্য।
জাকিয়ার মুখে তখন লাজুক কিন্তু প্রশান্তির হাসি, চোখে বিস্ময়ের আলো। আর বাবা আব্দুল জলিলের চোখে আনন্দ অশ্রু। তিনি বলেন, “এই চেয়ারটা শুধু একটা বসার জিনিস না—এটা আমার মেয়ের চলার পথ খুলে দিলো। ইউএনও ম্যাডাম যেন হাজারটা মেয়ের মুখে এমন হাসি ফোটাতে পারেন—সেই দোয়া করি।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া ইসলাম সীমা বলেন, “প্রতিবন্ধী শিশুরা আমাদেরই সন্তান। ওদের প্রয়োজন একটু ভালোবাসা, একটু সহানুভূতি। জাকিয়ার মুখের হাসিটা আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। যতদিন সম্ভব, মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করবো।”
এই ঘটনাটি শুধু একটি উপহার নয়, এটি একটি সমাজে মানবিকতার জাগরণ। ফুলপুরের মানুষ ইউএনও সীমার এ উদ্যোগে আপ্লুত।
জাকিয়ার হুইলচেয়ার পাওয়া যেন শুধুই কোনো যন্ত্র নয়, এটি একটি মেয়ের জীবনে স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার চাবিকাঠি।
এখন সে নিজেই চলতে পারবে, স্কুলে যেতে পারবে, নতুন করে জীবন গড়ার পথ খুঁজে পাবে।
একটি হুইলচেয়ার বদলে দিতে পারে একটি পৃথিবী—জাকিয়ার গল্প তারই এক অনন্য উদাহরণ।