
আব্দুল হক লিটন ময়মনসিংহঃ
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ১ নং ভুবকুড়া ইউনিয়নে সরকারি জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ২০টি অগভীর নলকূপ স্থাপনের কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের নামে কোনো কাজ শুরু না করেই তিন বছর আগে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা বিল উত্তোলন করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট ২০টি পরিবার তীব্র পানিসংকটে পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছে। নিরাপদ পানির অভাবে দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী বিল উত্তোলনের বহুদিন পর সম্প্রতি প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে আরও সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন না করে আগাম অর্থ উত্তোলনের ঘটনাকে স্থানীয়রা গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতি হিসেবে দেখছেন এবং বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জামাল হোসেন, হালুয়াঘাটের সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাজিব আহমেদ, মেকানিক আব্দুল কুদ্দুস ও খালিদসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অলি এন্টারপ্রাইজ।
অনুসন্ধানে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের সময়ের ছবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের কল রেকর্ড ফাঁস হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে, যা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে মাঠে নামলে, দীর্ঘ তিন বছর কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে সম্প্রতি তড়িঘড়ি করে কয়েকটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। দায়সারা ও নিম্নমানের কাজের ফলে কিছু নলকূপে সঠিকভাবে পানি উঠছে না, আবার অনেক নলকূপে ঘোলা পানি বের হচ্ছে। কোনোমতে ভুক্তভোগীদের মন রক্ষা করার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে এসব নলকূপ স্থাপন সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো নিরাপদ পানির অধিকার থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।
অনুসন্ধানে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের সময়ের ছবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের কল রেকর্ড ফাঁস হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে, যা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে নারাজ সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাজিব আহমেদ।
ভুক্তভোগী মোঃ হানিফ মিয়ার মা হাসিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,আমার পুত্রবধূ আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে মারা গেছে। আমরা সরকারি নিয়ম মেনে ফি জমা দিয়েছি। কিন্তু নলকূপ কোথায়, কেউ বলতে পারে না। কাগজে কাজ দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমার পরিবারের ১০ জনের বেশি মানুষ আজ পানির জন্য হাহাকার করছে। এটা শুধু দুর্নীতি না, এটা আমাদের জীবনের সঙ্গে প্রতারণা।
ভুবকুড়া ইউনিয়নের আদিবাসী বাসিন্দা হারুন সাংমা জানান, ২০২৩ সালে সরকারি ফি জমা দিয়েছি। তালিকায় নাম থাকার পরও আজ পর্যন্ত নলকূপ পাইনি। আমাদের দেওয়া টাকার কী হয়েছে জানি না। পানি না থাকায় পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে আছি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
ভুবনকুড়া ইউনিয়নের ঝলঝলিয়া হালিমাতুস সাদিয়া (রাঃ) মহিলা কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জানান, আমার মাদ্রাসায় ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। ২০০৩ সালে ১০ হাজার ৫০০ টাকা জমজমা দিয়েও এখনো কোন নলকূপ পাচ্ছিনা। নলকূপ প্রকল্পের তালিকায় নাম থাকলেও বাস্তবে সেটি স্থাপন করা হয়নি। ফলে ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানির অভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। আমরা খুব শিগগিরই কাজ শুরু করব। কাজ না করেই বিল উত্তোলনের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান, কিছু টাকা উত্তোলন করা হয়েছে কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে তা আমার জানা নেই। বিল উত্তোলনের বিষয়টি জেলা নির্বাহী প্রকৌশল অধিদপ্তরের এখতিয়ার।
ময়মনসিংহ জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ছামিউল হক জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ২০টি নলকূপ স্থাপন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৩ অর্থবছরের প্রকল্পের কাজ চলতি মাস থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তবে কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, জনগণের জন্য নিরাপদ ও সুপেয় পানির নিশ্চয়তা দেওয়াই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কাজ।
প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স অলি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একইভাবে সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাজিব আহমেদের সঙ্গেও একটু ফোনে যোগাযোগ করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তাদের এই নীরবতায় অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
হালুয়াঘাটের ভুবকুড়া ইউনিয়নের এই জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের অনিয়ম শুধু আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নয়, এটি একটি গভীর মানবিক সংকটের প্রতিফলন। কাজ ছাড়াই বিল উত্তোলনের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত দুদকসহ সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী