মোঃ আব্দুল হক লিটনঃ
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে ধারাবাহিক হামলা, হত্যা, নির্যাতন ও হুমকি সাংবাদিকরা মোকাবিলা করছেন, তা শুধু পেশাটির নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং পুরো দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
৭ আগস্টের ঘটনাটি যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার শ্বাসরোধের আরেকটি রক্তাক্ত প্রমাণ। বিকেলে ফেসবুক লাইভে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে, রাতের অন্ধকারে গাজীপুরের জনবহুল সড়কে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের কোপে নিথর দেহ রইলো পড়ে।
তার মৃত্যু শুধু একজন মানুষ বা একজন সাংবাদিকের জীবন শেষ করে দেয়নি— শেষ করেছে প্রশ্ন করার সাহস, দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার মনোভাব, এবং সত্য বলার এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
কারা এই ‘অদৃশ্য শক্তি’?
বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বহুদিন ধরেই দুটি শত্রুর মুখোমুখি, যারা চাঁদাবাজি, মাদক, দখল, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির সাথে জড়িত; এবং যারা এই অপরাধীদের ছায়া দেয়, রক্ষা করে এবং কখনো কখনো ব্যবহারও করে।
তুহিনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। বহু সাংবাদিক চাঁদাবাজি, জমি দখল, পরিবেশ ধ্বংস বা রাজনৈতিক অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন করার পর অজ্ঞাতনামা হামলাকারীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়, বিচার অধরা থেকে যায়।
সংবিধান সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে তারা যেন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে একা দাঁড়িয়ে আছেন। হত্যাকাণ্ড, হুমকি, গুম ও প্রতিটি ঘটনায় প্রশ্ন উঠে আসে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়? কেন দোষীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয় না? কেন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডকে ‘ব্যক্তিগত বিরোধ’ বলে পাশ কাটিয়ে দেওয়া হয়?
বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক সাংবাদিক ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ’-এর দিকে ঝুঁকছেন। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক তথ্য প্রকাশে বিরত থাকছেন। ফলে অপরাধীদের সাহস আরও বাড়ছে, গণতন্ত্রের শ্বাস আরও ক্ষীণ হচ্ছে।
একসময় যে সাংবাদিকতা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের ‘চোখ ও কান’, এখন সেটিকে ধীরে ধীরে অন্ধ ও বধির করার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকরা কয়েকটি দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। এর মধ্যে হলো, সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেতে হবে।
মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তা প্রটোকল নিশ্চিত করতে হবে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তা রক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করতে হবে।
পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে, সাংবাদিক হত্যা মানে শুধু একজনের মৃত্যু নয়, সত্য ও ন্যায়বিচারের মৃত্যু।
তুহিনের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্তের দামে রক্ষা করতে হয়। যদি রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম একসাথে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে আগামীতে হয়তো আরও অনেক তুহিন অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। আর আমরা হারাবো সত্যের কণ্ঠস্বরে, যা ছাড়া কোনো সভ্য সমাজ টিকে থাকতে পারে না।