মোঃ আব্দুল হক লিটনঃ
ময়মনসিংহের পিবিআই কার্যালয়ে সোমবার দুপুরে ছিল এক ভিন্ন আবহ। কোথাও ফুলের সুবাস, কোথাও সহকর্মীদের কণ্ঠে স্মৃতিচারণ, আর এর মাঝেই এক অনিবার্য সত্য বিদায়। দায়িত্বের আসন থেকে বিদায় নিচ্ছেন পুলিশ পরিদর্শক জনাব মোঃ আবুল কাশেম, পিপিএম। চার দশকের কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটলেও তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি ও অবদান চিরকাল বেঁচে থাকবে সহকর্মীদের হৃদয়ে।
পুলিশের পোশাকে দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান যে কতটা আবেগঘন মুহূর্ত হতে পারে, তার নিদর্শন মিলল এদিন। সহকর্মীদের চোখে জল, বুকভরা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বিদায় জানানো হলো একজন চৌকস, আদর্শবান ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তাকে।
৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালনের মধ্যে দিয়ে আবুল কাশেম দেখিয়েছেন সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর সাফল্যের গল্প যেন গোটা বিভাগের গর্ব। অসংখ্য ক্লুলেস খুন মামলার রহস্য উন্মোচন করেছেন তিনি নিপুণ তদন্ত দক্ষতায়। ফলে জনগণের আস্থা যেমন অর্জন করেছেন, তেমনি কর্মগৌরব হিসেবে অর্জন করেছেন “রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম)”-এর সম্মান।
বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পিবিআই ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার রকিবুল আক্তার। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আবুল কাশেম কেবল আমার অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তা নন, তিনি ছিলেন আমার সবচেয়ে ভরসার সহকর্মী, দায়িত্বশীল একজন মানুষ। সততা, নিষ্ঠা আর কর্মদক্ষতায় তিনি প্রমাণ করেছেন,একজন পুলিশ অফিসার কেমন হওয়া উচিত। তাঁর অবসর শুধু আমাদের অফিসের জন্য নয়, আমার ব্যক্তিগত জীবনেরও এক শূন্যতা। আমি তাঁর স্যার হলেও, সত্যিকার অর্থে তিনি আমাদের অনেককেই শিখিয়ে গেছেন কিভাবে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হতে হয়। আজ তাঁকে বিদায় দিতে গিয়ে বুক ভরে উঠছে শূন্যতায়, চোখ ভিজে উঠছে অশ্রুতে।
সহকর্মীরা জানান, তিনি ছিলেন প্রকৃত টিম লিডার। কঠোরতা থাকলেও তা ছিল দায়িত্ববোধ থেকে, আবার মানবিকতা ও সহমর্মিতা তাঁকে করে তুলেছিল সবার আপনজন।
নিজের বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে আবুল কাশেম বলেন,
এই দীর্ঘ কর্মজীবনে আমি চেষ্টা করেছি সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে। আজ সহকর্মীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দেখে মনে হচ্ছে, আমার এই চেষ্টা বৃথা যায়নি। পিবিআই পরিবারের প্রত্যেকের ভালোবাসাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।”
অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তগুলোতে ফুলেল শুভেচ্ছায় ভরে উঠল প্রাঙ্গণ। সহকর্মীরা তাকে বিদায় জানালেন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে। বিদায়ের ক্ষণে সবাই একবাক্যে বললেন, আপনার সততা, প্রজ্ঞা ও কর্মনিষ্ঠা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। অবসর-পরবর্তী জীবনে আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
বিদায় সংবর্ধনা মানেই কেবল চাকরির শেষ নয়, বরং এটি এক আবেগঘন ক্ষণ, যেখানে কর্মজীবনের স্মৃতি, সাফল্য ও অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। আবুল কাশেম, পিপিএম তার কর্মনিষ্ঠা দিয়ে যে উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন, তা আগামী প্রজন্মের পুলিশ কর্মকর্তাদের পথ দেখাবে নিঃসন্দেহে।