বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহ পরিণতি: শিক্ষকের ছদ্মবেশে কোটি টাকার জালিয়াত, রশিদুল অবশেষে গ্রেপ্তার
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
শিক্ষা মানুষের চরিত্র গঠনের হাতিয়ার। আর সেই হাতিয়ার ব্যবহারের দায়িত্ব যাঁর কাঁধে, তিনিই যদি হন বিশ্বাসঘাতক তবে সমাজ কোথায় দাঁড়াবে? ময়মনসিংহ সদর উপজেলার শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মোমেনশাহী ডিএস কামিল মাদ্রাসায় এমনই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শিক্ষক রশিদুল ইসলাম খান। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে শিক্ষকদের স্বাক্ষর জাল করে, ভূয়া পরীক্ষক নিয়োগ দেখিয়ে এবং নকল কাগজপত্র বানিয়ে তিনি আত্মসাৎ করেছেন প্রায় ২০ লাখ টাকারও বেশি সরকারি অর্থ। এই বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অবশেষে তাকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. মো. ইদ্রিস খান ঘটনার পেছনের গল্প ফাঁস করে বলেন, “আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। কখনো ভাবিনি একজন সহকর্মী এতটা নিচে নামতে পারে।” তাঁর কণ্ঠে ছিল হতাশা আর ক্ষোভের মিশেল।
ঘটনার সূত্রপাত কিছুদিন আগে, আরবি প্রভাষক মো. আব্দুর রউফ একটি মৌখিক অভিযোগ করেন— তাঁর স্বাক্ষর জাল করে রশিদুল ইসলাম তাকে চলতি পরীক্ষায় পরীক্ষক নিয়োগ দেখিয়েছেন। অধ্যক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে গোপনে প্রেরিত নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে চমকে ওঠেন অধ্যক্ষ নিজেই। অভিযোগ মিথ্যা নয়, বরং ভয়াবহ সত্য!
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, শুধু আব্দুর রউফ নন—শিক্ষক মো. মোফাজ্জল হোসেন, শামসুল আলম, আব্দুল হাফিজ ও হারুনুর রশিদসহ অন্তত ১০-১২ জনের নাম ও স্বাক্ষর নকল করে রশিদুল ইসলাম সরকারি পরীক্ষায় ভূয়া পরীক্ষক হিসেবে দেখিয়ে অনৈতিকভাবে অর্থ উত্তোলন করেছেন। কাগজে কলমে এসব অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ শিক্ষক জানেনই না, কখন, কীভাবে, কার নামে পরীক্ষা হয়েছে!
অধ্যক্ষ আরও জানান, “রশিদুল দীর্ঘ ৮-৯ বছর ধরে এই অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছে। প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারিনি। কিন্তু যখন দেখলাম কিছু হিসাব মিলছে না, তখন অনুসন্ধান চালাই। তাতে ধরা পড়ে তার জালিয়াতির ভয়ঙ্কর জাল।”
এই প্রতারণার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে, প্রতিষ্ঠানের সম্মানকে, আর সবচেয়ে বড় কথা—বিশ্বাসের ভরাডুবি হচ্ছে। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ ড. মো. ইদ্রিস খান ময়মনসিংহ কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
থানার অফিসার ইনচার্জ শিবিরুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেই। অভিযুক্ত রশিদুল ইসলাম খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাসুদ জামালী মামলাটি খতিয়ে দেখছেন। যথাসময়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।”
সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, “শিক্ষক যদি হয় প্রতারক, তাহলে আমরা কার উপর ভরসা করব?” অনেক অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “আমরা সন্তানদের যাদের হাতে দিচ্ছি, তারা যদি এমন হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন মাদ্রাসার সৎ ও নিরীহ শিক্ষকরা। একইসাথে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদরাও।
শিক্ষা নয়, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত প্রতারণা। এই প্রতারক যেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা চুরি করে, জাতির ভবিষ্যৎকে কলঙ্কিত না করতে পারে—এই চেতনাই আজ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।