
আব্দুল হক লিটনঃ
ছয় বছরের শ্রম, প্রায় ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ। দেশি-বিদেশি দুষ্প্রাপ্য ফলের গাছ, নিরাপদ সবজি উৎপাদন, ঔষধি গাছ, ভার্মি কম্পোস্ট ও জৈব সার তৈরির ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল একটি মডেল গ্রামে কৃষি উদ্যোগ। সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন সময়ে পরিদর্শন করেছেন বাগানটি। অথচ রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে রাতের আঁধারে সেই বাগানের শতাধিক ফলজ গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার মূলাবাড়ী এলাকায় কৃষি উদ্যোক্তা ও অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনীর সার্জেন্ট মোঃ আকাশ মিয়ার বাগানে এ ঘটনা ঘটে। বাগান মালিকের দাবি, শামীম মেম্বারের উদ্যোগে ভেকু দিয়ে প্রথমে রাস্তার জন্য মাটি কাটতে গিয়ে বাগানের সীমানার কিছু গাছ উপড়ে ফেলে। আলামিনের নেতৃত্বে ১০-১৫ জন লোক এসে মব সৃষ্টি করে বাগান মালিক আকাশ মিয়াকে লাঞ্চিত করে। তাৎক্ষণিক ইয়াসিন মেম্বারের নেতৃত্বে ইউনিয়ন পরিষদে বিষয়টির নিষ্পত্তি শেষে রাতে বাড়িতে ফেরার সময় বাগানে ঢুকে মাল্টা, ড্রাগন, লেবু, লটকন ও সুপারি গাছসহ শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়।
এ ঘটনায় আকাশ মিয়া তারাকান্দা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি তদন্ত করে সত্যতা যাচাইয়ের পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাস্তা নিয়ে বিরোধ, এরপর গাছ কর্তন
অভিযোগপত্র ও বাগান মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, বাগানের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে দীর্ঘদিন ধরে একটি হালট পড়ে ছিল। ওই জায়গা দিয়ে রাস্তা করার বিষয়টি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। এ বিষয় নিয়ে কথা হলে হালটের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি সম্মত ছিলেন বলে জানান আকাশ মিয়া।
তবে ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে তার অনুপস্থিতিতে ভ্যাকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটার সময় বাগানের সীমানার খুঁটিসহ কয়েকটি লেবু গাছ উপড়ে ফেলা হয়। খবর পেয়ে সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে গিয়ে মাটি কাটার কাজ বন্ধ রাখতে বললে আলামিনসহ কয়েকজন লোহার রড ও বাঁশের লাঠি নিয়ে তাকে ধাওয়া করে এবং হত্যার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এরপর রাতে বাগানের ৭টি ফলন্ত মাল্টা, ১২টি ড্রাগন, ১০০টি লেবু, একটি লটকন ও তিনটি সুপারি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এতে আনুমানিক দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাগান মালিক।
তিনি বলেন, রাস্তার জন্য যতটুকু জায়গা প্রয়োজন, তা নিয়ে আমার আপত্তি ছিল না। কিন্তু আমার সঙ্গে কথা কাটাকাটির পর বিষয়টি অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার ছয় বছরের শ্রমে গড়ে ওঠা বাগানের গাছ কেটে দেওয়া হয়েছে। এখনো হুমকি দেওয়া হচ্ছে, বাকি গাছও কেটে ফেলতে পারে। তার অভিযোগ, ঘটনার পর নিজেদের দায় এড়াতে তার বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ দেওয়াসহ নানা কৌশল অবলম্বনের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, শুধু ফলের বাগান হিসেবেই নয়, নিরাপদ কৃষির মডেল গ্রাম হিসেবেও স্থানীয়দের কাছে বাগানটি একটি ব্যতিক্রমী কৃষি উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত।
এখানে শুধু ফলের গাছই নয়, নিরাপদ সবজি উৎপাদনের জন্য আলাদা বেড, ফল ও ঔষধি চারার বেড, ঔষধি গাছের বাগান, ভার্মি কম্পোস্ট শেড, খামারজাত সার উৎপাদন শেড এবং মাটি-গোবর মিশ্রণের ব্যবস্থা রয়েছে।
বাগানে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ভার্মি কম্পোস্ট, জৈব সার, পচা গোবর ও খামারজাত সার ব্যবহার করা হচ্ছে।
কীটনাশকের পরিবর্তে সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ, হলুদ আঠালো ফাঁদ, ফল ব্যাগিং ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে নিরাপদ পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সহজ নয়। বছরের পর বছর পরিচর্যা ও বিনিয়োগের পর একটি বাগান উৎপাদনক্ষম অবস্থায় পৌঁছায়।
সরকারের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগের মধ্যেই এমন ঘটনা বর্তমান সরকার পরিবেশ রক্ষা, বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে গাছ লাগানোর উদ্যোগকে উৎসাহিত করছে।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ ও ফলদ বৃক্ষের আবাদ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে বছরের পর বছর পরিচর্যা করে গড়ে ওঠা একটি ফলের বাগানের গাছ কেটে ফেলার অভিযোগটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ব্যক্তিগত কৃষি উদ্যোক্তার নিরাপত্তা নিয়েও।
বাগান মালিকের দাবি, একটি সরকারি হালটের রাস্তা প্রয়োজন হলে প্রশাসনিকভাবে সেটি নির্ধারণ করা যেত। কিন্তু রাস্তার বিষয়কে কেন্দ্র করে বাগানের ভেতরের ফলজ গাছ কেটে ফেলার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তারাকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ অরুনিমা কাঞ্জি শুভ্রা শাওন বলেন, মডেল গ্রামের আকাশ মিয়া একজন ভালো কৃষি উদ্যোক্তা। তার বাগানে এমন কিছু দুষ্প্রাপ্য ফলজ গাছ রয়েছে, যা সচরাচর অন্য বাগানে দেখা যায় না। যারা এ ধরনের কাজ করেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারি পর্যায়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হালটের রাস্তা উদ্ধারের সময় কিছু লেবু গাছ কর্তনের বিষয়টি তার নজরে এসেছে। তবে বাগানের ভেতরে মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলজ গাছ কেটে ফেলার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
স্থানীয়রা জানান, রাস্তা নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের পর দিনের বেলায় কিছু গাছ কাটা হয়। পরে রাতের বেলায় আরও লোকজন নিয়ে বাগানের ভেতরের গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বাগানটি এলাকায় কৃষির একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের পরিচর্যায় তৈরি বাগানটি নষ্ট হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার ক্ষতি হবে না, স্থানীয়ভাবে নিরাপদ কৃষি চর্চারও ক্ষতি হবে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
বাগানটির আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা দেখতে বিভিন্ন সময়ে সরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই পরিদর্শন করেছেন।
একই সঙ্গে কৃষির আধুনিক পদ্ধতি, জৈব সার উৎপাদন, ভার্মি কম্পোস্ট, নিরাপদ সবজি উৎপাদন এবং বিকল্প বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্থানীয়দের উৎসাহিত করার ক্ষেত্রেও বাগানটি ভূমিকা রাখছিল।
এখন সেই বাগানের কাটা গাছের সারি দেখে হতাশ বাগান মালিক ও স্থানীয়রা।
বাগানের মালিক আকাশ মিয়া বলেন, গাছগুলো শুধু গাছ ছিল না, এগুলোর পেছনে আমার ছয় বছরের শ্রম, টাকা ও স্বপ্ন ছিল।
এ বিষয়ে তারাকান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ বলেন, বাগানের গাছ কর্তনের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অভিযোগে অভিযুক্ত আলামিনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, তাদের সাথে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছে, গাছ কাটার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, বাগানের ভিতরে যারা গাছ কর্তন করেছে আমিও তাদের বিচার চাই।
এখন তদন্তেই বের হয়ে আসার কথা এর সাথে কারা জড়িত,রাস্তা নিয়ে বিরোধের প্রকৃত কারণ কী, হালটের জায়গায় মাটি কাটার অনুমতি বা বৈধতা ছিল কি না, বাগানের ভেতরের গাছগুলো কারা এবং কী উদ্দেশ্যে কেটেছে এবং পুরো ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে সরকারের বৃক্ষরোপণ ও নিরাপদ কৃষি উদ্যোগের সময়ে এমন একটি কৃষি উদ্যোগ কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, সেটিও সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সুধীমহল।