মোঃ আব্দুল হক লিটনঃ
গরিব ও অসহায় রোগীদের কষ্টের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল একদল দালাল চক্র। তারা নিজেদের হাসপাতালের কর্মচারী বা পরিচিতজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে রোগী ও স্বজনদের ভুল পথে চালিত করত। কম খরচে উন্নত চিকিৎসা বা অভিজ্ঞ ডাক্তার দেখাবে, এমন মিথ্যা আশ্বাসে বিভ্রান্ত করে পাঠিয়ে দিত অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। কেউ কেউ রোগীকে জিম্মি করেও রাখত। এই প্রতারণার জালে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে খালি হাতে ফিরতে হতো গরিব মানুষগুলোকে।
অবশেষে র্যাবের তৎপরতায় ভাঙল এই প্রতারণার দৌরাত্ম্য। বুধবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে র্যাব-১৪, সদর কোম্পানির নেতৃত্বে পরিচালিত মোবাইল কোর্ট অভিযানে দালাল চক্রের ১৮ জন সক্রিয় সদস্যকে আটক করা হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন সদর কোম্পানি, র্যাব-১৪, কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লীডার শাহ্ মোঃ রাশেদ রাহাত। উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ রাশিক খান শূষান, যিনি ঘটনাস্থলেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন।
অভিযানে আটককৃতদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা প্রদানসহ প্রতারণামূলক কার্যক্রমের প্রমাণ মেলে। পরে দণ্ডবিধির ১৮৬ ধারায় ১৬ জনকে ২০ দিনের, ১ জনকে ১৪ দিনের এবং অপর ১ জনকে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
গ্রেফতারদের মধ্যে রয়েছেন,
চরপাড়ার আক্কাস আলীর পুত্র মোঃ মাসুদুল করিম, কিসমতের চান মিয়ার পুত্র ছামির, বেলতলীর শফিকের পুত্র রুবেল, চরপাড়ার তোতা মিয়ার পুত্র আজাহার, ছিপানের আঃ রাহেদের পুত্র শামীম, ত্রিশালের নৈমদ্দিনের পুত্র আশরাফুল, ঈশ্বরগঞ্জের আঃ সিদ্দিকের পুত্র হারিদুল ইসলাম, চরপাড়ার ছালু মিয়ার পুত্র আলামিন, চড়পাড়ার আব্দুল হান্নানের পুত্র তুষার আহম্মেদ, নতুন বাজারের বসুনাথ হরিজনের পুত্র বিজয়, শিকারীকান্দার মৃত আলতাফ হোসেনের পুত্র নজরুল ইসলাম, গৌরীপুরের আরশেদ আলীর পুত্র ইদ্রিস আলী, মুক্তাগাছার কামরুজ্জামানের পুত্র শহিদুল ইসলাম, চরপাড়ার মনিরের পুত্র ইমন, চরপাড়ার আঃ গফুরের পুত্র নয়ন মিয়া এবং শেরপুরের সজবরুখীলার সুশিল দাসের পুত্র চঞ্চল।
এছাড়া চরপাড়ার মৃত শওকত আলীর পুত্র আঃ রাজ্জাককে ১৪ দিন এবং ফুলবাড়িয়ার সারটিয়ার নওশের আলীর পুত্র মোঃ আলামিনকে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
অভিযানের পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন রোগী ও স্বজনরা। কেউ কেউ বলছেন, এমন অভিযান আরও আগে হলে অনেকে প্রতারিত হতো না।
ঘটনাস্থললেই একজন রোগীর স্বজন বলেন,
আমার ভাইকে বলেছিল কম খরচে ভালো ডাক্তার দেখাবে, পরে দেখি ওরা প্রতারক। টাকা হারালাম, চিকিৎসাও ঠিকমতো হলো না। এখন র্যাব এসে ওদের ধরেছে, মনে হচ্ছে ন্যায় বিচার পেয়েছি।
র্যাবের সদর কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লীডার শাহ্ মোঃ রাশেদ রাহাত বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার প্রতিটি কোণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গরিব ও অসহায় রোগীদের নিয়ে প্রতারণা বা ক্লিনিক-দালাল সিন্ডিকেটের কোনো স্থান এই শহরে থাকবে না। র্যাব সবসময় জনগণের পাশে থেকে অপরাধ দমনে কাজ করছে এবং করবে।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ রাশিক খান শূষান বলেন, এই দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল এলাকায় সক্রিয় ছিল। আজকের অভিযান একটি সতর্ক বার্তা, রোগী নিয়ে প্রতারণা করলে কাউকেই ছাড়া দেওয়া হবে না। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
অভিযানের পর হাসপাতাল চত্বরে জনমনে এক ধরনের স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, এই দালালমুক্ত অভিযান অব্যাহত থাকলে সরকারি হাসপাতাল আবারও গরিব মানুষের আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠবে।