তপু রায়হান রাব্বি ফুলপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধিঃ
নিষ্পাপ এক শিশু পৃথিবীর আলো দেখেছে, অথচ জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বাবা কোথায়? তা কেউ জানে না। ফুলপুরের রাস্তায় বসবাস করা মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণীর কোল জুড়ে এসেছে ফুটফুটে ছেলে সন্তান। তার কোলজুড়ে শীতল নিঃশ্বাস ফুঁকছে, কিন্তু সেই শিশুকে রক্ষা করার জন্য যে বাবার থাকা প্রয়োজন, তার কোনো ছায়াই নেই।
যে নরপশু তার জীবনের সাথে জঘন্য খেলা খেলেছে, সে কোথায়? কখনো কি তার অপরাধের মুখোমুখি হবে? সমাজের চোখে এই মা-শিশু জুটি একা, নিঃসঙ্গ, এবং অত্যন্ত দুর্বল। রাস্তায় থাকা অসহায় এই তরুণী আজো নির্দিষ্ট নিরাপত্তার ছায়া ছাড়াই তার সন্তানের জন্য লড়ছে। প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক অব্যক্ত যন্ত্রণা, যেখানে মা ও শিশুর নিরাপত্তা, সামাজিক স্বীকৃতি, এবং মানবিক সহানুভূতির আকুতি সব মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতি তৈরি করছে,যা কেবল মানুষকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
বুধবার (২০ আগস্ট) বিকেলে সিংহেশ্বর ইউনিয়নের ডুবার পাড় বাজার সংলগ্ন একটি বাড়িতে ঘটেছে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া ইসলাম সীমা রাতেই নার্সসহ অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে মা ও শিশুকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। মা ও শিশু বর্তমানে চিকিৎসাধীন। শঙ্কা এখনও পুরোপুরি কাটেনি, তবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন।
গত বছরও একই উপজেলার মানসিক ভারসাম্যহীন সুফিয়া (ওরফে শিউলি) জন্ম দিয়েছেন জমজ সন্তানকে। তখনো ‘বাবা’ ছিলেন না কেউ। তবে সমাজের সহানুভূতি ও প্রশাসনের উদ্যোগে তারা দত্তক পরিবারে আশ্রয় পেয়েছিলেন।
রাস্তার অসহায়, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারীরা কি শুধুই লম্পটদের শিকার হওয়ার জন্যই জন্ম নিয়েছে? আমাদের সমাজ কি শুধু তাদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের পশুত্বের খিদে মেটাবে? একের পর এক ঘটনা আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া ইসলাম সীমা বলেন,
“আমি একজন নারী। ঘটনাস্থলে গিয়ে চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি। আমরা এমন সমাজে বাস করছি, যেখানে মানসিক ভারসাম্যহীন নারীরাও নিরাপদ নয়? শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. শিহাব উদ্দিন খান জানান,
এটি আমাদের জন্য লজ্জার ইতিহাস। গত বছরও এমন ঘটনা ঘটেছে। এবারও পুনরাবৃত্তি হলো। শিশুটিকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দত্তক দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
তাকওয়া অসহায় সেবা সংস্থার পরিচালক তপু রায়হান রাব্বি বলেন,
“ভারসাম্যহীন মানুষগুলো অবুঝ শিশুর মতো। কিছু নরপশু সুযোগ নেয়, তাই তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, তাহলেই মানবতা বেঁচে থাকবে।”
একজন মা আছে,কিন্তু কোনো বাবা নেই। জন্মের প্রথম দিন থেকেই ফুটফুটে শিশু সমাজের চোখে ‘অসহায়’।
তার ভবিষ্যৎ কে দেখবে? কে রক্ষা করবে তার অধিকার?
আজও একটাই সত্য, মানবতা হেরে যাচ্ছে, জয়ী হচ্ছে নরপশুর নিষ্ঠুরতা।