রোগীর কান্না থামাতে এবার র‌্যাবের কড়া অভিযান: ময়মনসিংহে সিলগালা একের পর এক অবৈধ হাসপাতাল

মোঃ আব্দুল হক লিটনঃ

ময়মনসিংহ নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে বেনামে, অনুমোদনবিহীনভাবে পরিচালিত অসংখ্য ক্লিনিক ও হাসপাতাল যেন মানুষের জীবনের ওপর ভয়ংকর এক ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রোগীর জীবনের নিরাপত্তা যেখানে প্রধান হওয়া উচিত—সেখানে অবহেলা, প্রতারণা, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, অনভিজ্ঞ লোক দিয়ে অপারেশন—এসবই ছিল ভয়ংকর বাস্তবতা। এই অনিয়মের বিরুদ্ধে অবশেষে কঠোর অবস্থান নেয় র‌্যাব–১৪। সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে টানা অভিযান, যা পুরো শহরজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

র‌্যাব ১৪, ময়মনসিংহ এর  উপ-অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লীডার শাহ্ মোঃ রাশেদ রাহাতের নেতৃত্বে  শক্তিশালী  টিম নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল, নার্সিং হোম ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ঢুকে পড়ে। প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই দেখা যায় ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র—নোংরা অপারেশন থিয়েটার, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অকার্যকর চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণহীন কর্মচারী, লাইসেন্সবিহীন চিকিৎসা কার্যক্রম—সব মিলিয়ে একটি বিশৃঙ্খল ও জীবনহানিকর পরিবেশ।

অভিযানে রয়েল কেয়ার (প্রাঃ) হাসপাতালে পাওয়া যায় অপর্যাপ্ত কাগজপত্র, লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন এবং পরিষেবা মানের ঘাটতি। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেওয়া হয় ১ লাখ টাকা জরিমানা। কথা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হানা দিলে কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীরা তালা মেরে পালিয়ে যায়—যা অনিয়মের গভীরতাই প্রকাশ করে। দি নিউ জনতা ডায়াগনস্টিক এন্ড হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারসহ সব কার্যক্রম সিলগালা করা হয়, কারণ সেখানেও পাওয়া যায় বিপজ্জনক মাত্রায় অনিয়ম।

See also  কেন্দুয়ায় মানবপাচার চক্রের চীনা নাগরিকসহ ২ জন আটক, ৩ তরুণী উদ্ধার

দিবা-রাত্রি ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রবেশ করতেই নজরে আসে অপরিষ্কার অপারেশন কক্ষ ও অননুমোদিত মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের উপস্থিতি। প্রতিষ্ঠানটিকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রুম্পা নার্সিং হোম এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অপারেশন থিয়েটার এতটাই নিম্নমানের ছিল যে, র‌্যাব সদস্যরা তৎক্ষণাৎ সেটি সিলগালা করেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ার খোকনকে আইন লঙ্ঘনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

সেন্ট্রাল হাসপাতাল (প্রাঃ) এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অপারেশনের নামে রোগীর জীবনের ঝুঁকি বাড়ানো হচ্ছিল—এখানেও অপারেশন থিয়েটার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দায়ী মাসুম রাহাত খানকে দেওয়া হয় ১০ দিনের কারাদণ্ড। আধুনিক হাসপাতাল (প্রাঃ) এর কার্যক্রম ছিল নোংরা, বিশৃঙ্খল ও মানহীন। প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং কর্মচারী মতিউর রহমানকে সাত দিনের জেল দেওয়া হয়। নিউ নাগরিক হাসপাতাল (প্রাঃ)–এও নজিরবিহীন অনিয়ম পাওয়া গেলে তাদের জরিমানা করা হয় ১ লাখ টাকা।

See also  শ্রীবরদী সীমান্তে বিজিবির অভিযান: প্রায় ১৯ লাখ টাকার ভারতীয় পন্য জব্দ

এ ছাড়া গাজী হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জুনায়েদ (প্রাঃ) হাসপাতালসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক দণ্ড দেওয়া হয়। ছায়ার মতো ছড়িয়ে থাকা এসব অবৈধ হাসপাতাল থেকে মোট ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

অভিযানে  নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহ মোহাম্মদ জুবায়ের এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. শারমিন ইসলাম সহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।  পুরো অভিযানের সময় তারা বারবার রোগীর নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় র‌্যাবের এ অভিযানকে মানুষ স্বাগত জানাচ্ছে। নগরীর ব্যস্ত জনতার অনেকেই বলেন—বছরের পর বছর আমরা ভয় নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছি। আজ প্রথমবার মনে হলো—আইন আছে, প্রশাসন আছে, মানুষ বাঁচার সুযোগ পাচ্ছে।”

এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু অনিয়মই সামনে আসেনি, বরং প্রকাশ পেয়েছে স্বাস্থ্যসেবার নামে বেড়ে ওঠা বিপজ্জনক বাণিজ্যের কালো দিক। র‌্যাব–১৪ জানিয়েছে—অবৈধ ও মানহীন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে, থামবে না।

About Abdul Hoque Liton

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share with