মমেকে অগ্নিকাণ্ডের পর ৬ মৃত্যু নিয়ে তোলপাড়, প্রশাসন বলছে নেই প্রমাণ

রিপোর্টারঃ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছয়জন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন বলে খবর ছড়ালেও প্রশাসনের অনুসন্ধানে এর কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে নিহতদের স্বজনদের দাবি, আগুনের পর আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কিতে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে মমেক হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এ সময় অনেকে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন।
এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছয়জন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ূন কবীর। পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, হাসপাতালের রেজিস্টার, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক-নার্স, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ছয়জনের পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, মৃত্যুর তালিকায় থাকা একজনকে জীবিত অবস্থায় চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। তালিকায় থাকা বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আগুনের ঘটনায় কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন নিহতদের স্বজনরা। তাদের দাবি, আগুনের পর আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে অন্তত দুজন মারা গেছেন।
নিহত কুলসুম আক্তার তারাকান্দার বালিখা এলাকার শহিদুল ইসলামের স্ত্রী। তার ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধিন মমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল। স্বজনরা জানান, আগুন লাগার পর ছেলেকে নিয়ে কুলসুম সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় হুড়োহুড়িতে তিনি পড়ে যান। পরে তাকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয় বলে দাবি স্বজনদের।
অপর নিহত শাহজাহান মনির ফুলপুরের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি যক্ষ্মার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার ছেলে পলাশ মোল্লার দাবি, আগুনের সময় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় পেছন থেকে ধাক্কা খেয়ে তার বাবা পড়ে যান। এ সময় তার মা ও খালাও আহত হন। পরে শাহজাহানকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
এদিকে হাসপাতালের মৃত্যুর তালিকায় জাহানারা আক্তার নামে একজনের নাম থাকলেও তিনি জীবিত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ। তিনি জানান, জাহানারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির মধ্যে একটি বন্ধ থাকায় আগুনের সময় রোগী ও স্বজনদের একটি সিঁড়ি দিয়েই নিচে নামতে হয়েছে। এতে সেখানে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়। এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখার কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে এতে কোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে ১০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। প্রাথমিকভাবে লিফটের কন্ট্রোল রুমে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অথবা অতিরিক্ত উত্তাপ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তের পর আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অগ্নিকাণ্ডের পর ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও প্রশাসনের অনুসন্ধানে এর প্রমাণ না পাওয়া এবং স্বজনদের ভিন্ন দাবিতে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারা কীভাবে মারা গেছেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী এবং আগুনের সময় হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায়।

See also  ময়মনসিংহ বিসিকে নাইটগার্ড কয়েল ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকান্ড, অর্ধ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

About Abdul Hoque Liton

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share with