
ময়মনসিংহ থেকে মোঃ আব্দুল হক লিটন
একটি উন্নয়ন প্রকল্প কতটা আশীর্বাদ হয়ে ওঠে, তার সব নির্ভরতা থাকে পরিকল্পনার স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়নের দায়বদ্ধতায়। কিন্তু ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী স্টিল আর্চ ব্রিজ প্রকল্প যেন এখন সেই ব্যতিক্রম। কোটি কোটি টাকার প্রকল্পটি ঘিরে উঠছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, উদ্বেগের পর উদ্বেগ।
রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ সহজীকরণ এবং মহানগরের ভেতরের যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর একনেকের অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির পরিকল্পনায় ছিল ৩২০ মিটার দীর্ঘ স্টিল আর্চ ব্রিজ এবং দুই পাশে ৫.১ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। অনুমোদিত মোট প্রকল্প ব্যয় ছিল ৩,২৬৩ কোটি টাকা।
কিন্তু বাস্তবে এই নকশা আর নেই, সেই ব্যয়ও নেই। পরিবর্তিত সংযোগ সড়ক এখন ৮.২ কিলোমিটার। ভূমি অধিগ্রহণও বেড়েছে ৮১.৫৬ একর থেকে ১১৩ একরে। ফলে বাড়তি ব্যয় দাঁড়াতে যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা!
শনিবার ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে নাগরিক সংগঠন ‘ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলন’-এর সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উঠে আসে। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সমন্বয়ক আবুল কালাম আল আজাদ। তাঁর অভিযোগ, “একনেক অনুমোদিত মূল নকশাকে উপেক্ষা করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংযোগ সড়কে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে কিছু প্রভাবশালী রিয়েল এস্টেট কোম্পানি লাভবান হয়।”
সংগঠনের দাবিতে, এই পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, অন্যদিকে নাগরিক ভোগান্তিও বাড়বে বহুগুণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত জমির বড় একটি অংশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের মালিকানাধীন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে: প্রকল্প সংশোধনের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল?
ময়মনসিংহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র ফয়সাল ফারনিম বলেন, “এই প্রকল্পে জনস্বার্থ উপেক্ষা করে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। ব্রিজ সংযোগের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা, কৃষিজমি এবং শত শত পরিবারের বসতভিটা উচ্ছেদের শঙ্কা রয়েছে।”
ব্রিজের নতুন সংযোগ সড়ক যুক্ত হচ্ছে পুরনো চায়না সেতু হাইওয়ের সঙ্গে। বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করছেন পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন মহল।
সংগঠনের সদস্য বিপ্লব নিভ বলেন, “এতে করে যানজট আরও বাড়বে, কারণ মূল সড়কের ধারণক্ষমতা এই সংযোগের জন্য প্রস্তুত নয়। এমনিতেই ময়মনসিংহ বিশ্বের নবম ধীরগতির শহর। প্রকল্পটি এভাবে বাস্তবায়িত হলে আমরা হয়তো পঞ্চম ধীরগতির শহরের তালিকায় চলে যাব।”
এমন অভিযোগ ও উদ্বেগের মধ্যেই ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ রিট দায়ের করা হয়েছে। আবুল কালাম আল আজাদ বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য শীর্ষক মামলায় আদালত রুল জারি করেছেন, যেখানে একনেক অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
তবে সড়ক ও জনপথ মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি এখনও প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এই গড়িমসি নিয়েও ক্ষোভ জানান নাগরিকরা।
সংবাদ সম্মেলনে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলন—একনেক অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন, জনসমক্ষে মূল নকশার প্রদর্শন,
নকশা পরিবর্তনের নেপথ্যের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান চিহ্নিতকরণ, দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত,
প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ,
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণ কাজ স্থগিত,
আবুল কালাম আল আজাদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা ব্রিজের বিরুদ্ধে না, আমরা চাই দ্রুত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন হোক। যেন এটি ময়মনসিংহবাসীর জন্য অভিশাপ না হয়ে, বরং আশীর্বাদে রূপ নেয়।”
উন্নয়ন প্রকল্পের পেছনে বরাদ্দ হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা জনগণের করের অর্থ। সেটি যদি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অপচয় হয়, তবে প্রশ্ন তোলা দায়িত্ব নাগরিক সমাজের।
কেওয়াটখালী স্টিল আর্চ ব্রিজ ময়মনসিংহের উন্নয়নে মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে— যদি সেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আর মানুষের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।


















