
মোঃ আব্দুল হক লিটন, হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ)
জীবনের এক অনন্য অধ্যায় কলেজ জীবন। যেখানে বই-খাতার গন্ধ মিশে থাকার কথা স্বপ্ন আর সম্ভাবনায়, সেখানে প্রতিদিন কোর্ট-কাচারির চত্বরে উপস্থিত, এই হলো হালুয়াঘাটের ভবনকুড়া গ্রামের দুই কলেজ শিক্ষার্থী মনির হোসেন (২৬) ও আফরোজা (৩০)-এর বাস্তবতা।
এতসবের পেছনে রয়েছে স্থানীয়ভাবে ‘মামলাবাজ’ হিসেবে কুখ্যাত মোঃ দুলাল মিয়ার একের পর এক মিথ্যা মামলার ভয়াবহ ছায়া।
গত কয়েক মাসে ময়মনসিংহ আদালতে দায়ের হয়েছে দুটি ফৌজদারি মামলা—যার অভিযোগে রয়েছে মনির ও আফরোজা এবং তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগ। অথচ স্থানীয় লোকজন বলছেন, এসব অভিযোগের ভিত্তি নেই।
দুলালের দুটি করা মামলার নথিপত্র দেখে জানা যায়, দ্বিতীয় মামলায় উল্লেখ রয়েছে গত ৫ মে সকাল ১০টায় দুলাল মিয়াকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এ মামলার যে সময়ের ঘটনা বলা হয়েছে, সে সময় মনির-আফরোজাসহ পুরো পরিবার গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ এর দায়ের করা মামলায় আদালতে হাজির ছিল। এদিকে প্রথম মামলাটির আসামি ছিল মনির সহ তার পরিবারের লোকজন। আবার একই মামলার সাক্ষী মনির ও তার বোন আফরোজা। এতেই বোঝা যায় মামলা দুটি মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন,
“আমি নিজেই জানি না আমাকে দুলালের মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে। আমি কোনো ঘটনাই দেখিনি। পর পর যে দুটি মামলা করেছে এসব একেবারেই মিথ্যা ও বানোয়াট।কলেজ পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থীকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং হয়রানি করতেই এসব মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইউনুস আলীর বলেন,
“দুলাল মিয়া মামলাবাজ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। দুই ভাইবোন কলেজে পড়ে, তারা তাদের জায়গায় থাকছে। কাগজপত্র ছাড়াই তাদেরকে উচ্ছেদ করতে নানা কৌশলে মামলা দিচ্ছেন। শুধু তাই নয় দুলাল মিয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর বিস্তার অভিযোগও রয়েছে। যা লোমহর্ষক ঘটনা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় যুবক আল মামুন বলেন, “দুলালের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধী ধর্ষণের অভিযোগ থাকায় গ্রামে দরবার সালিস বসিয়ে প্রকাশ্যে তার বিচার করা হয়েছে। এরপর থেকেই বেপরোয়া হয়ে যায় দুলাল। যারা তার বিপক্ষে ছিল তাদের বিরুদ্ধেই প্রতিশোধ নিতেই মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।
কলেজ শিক্ষার্থী মনির ও আফরোজা জানান,তারা হালুয়াঘাট উপজেলা দুটি কলেজে লেখাপড়া করছেন। এখন বইখাতার বদলে হাতে মামলার কাগজ। পড়ালেখা তো স্বপ্নের মতো।”তাদের ইচ্ছা ছিল সংসার চালানোর পাশাপাশি লেখাপড়া শেষ করে ভালো একটি সরকারি চাকরি করবেন। সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। বর্তমানে তারা ক্লাসের যেতেও ভয় পায়। মামলার কারণে আত্মীয়-স্বজনরাও দূরে সরে গেছেন। একের পর এক মিথ্যা মামলার ফাঁদে পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ জীবন অনিশ্চিত বলে দাবি করেন তারা।

এলাকাবাসী বলছে, মনির-আফরোজার পরিবার যে জায়গায় বসবাস করছে তার সুনির্দিষ্ট কাগজপত্র নেই, আবার দুলাল মিয়াও কোন কাগজ পত্র দোখাতে পারেনাই । জমির বিরোধকে কেন্দ্র করেই এই মামলা-পাল্টা মামলার জন্ম। তবে কাগজপত্র নয়, মুখ্য হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষকে দমন করতে মামলার দাপট।
দুলাল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তাঁর স্ত্রী সাহিদা খাতুন বলেন, আমার শ্বশুরের জমি ওরা দখল করে আছে। না সরলে আরও পাঁচটা মামলা করব।”
নাগরিক নেতারা বলছেন, উভয় মামলাই দণ্ডবিধির ১০৭/১১৭ ধারায় দায়ের করা হয়েছে—‘শান্তি ভঙ্গ’ ও ‘অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির’ অভিযোগে। অথচ মামলা দুটি খতিয়ে দেখলে সময়, স্থান, অভিযোগ ও সাক্ষীদের এমন মিল পাওয়া যায়, যা বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহারের জ্বলন্ত প্রমাণ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার প্রবণতা বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আর নিরীহ মানুষ হয় ভুক্তভোগী।
কলেজ শিক্ষক সুলতান আহমেদ জানান,
একটা সমাজ তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যায়। মনির ও আফরোজা সেই সম্ভাবনার প্রতীক। কিন্তু দুলালের মামলার ছায়ায় আজ তারা শঙ্কিত, হতাশ ও দিশেহারা।
প্রশাসন, আদালত ও সমাজ—এই তিন স্তরেরই উচিত এই মামলাবাজির সংস্কৃতিকে রুখে দাঁড়ানো। এখনই ব্যবস্থা না নিলে হারাবে শুধু দুটি শিক্ষার্থী নয়, সমাজ হারাবে তার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।


















