
ওয়ান লাইন” জুয়ায় সর্বনাশ: লাখো নারীর স্বপ্নভঙ্গ, সমাজে বিভক্তি ও ধ্বংসের ছায়
ধোবাউড়া গোয়াতলায় রয়েছে এই চক্রের মূল হোতা
মোঃ আব্দুল হক লিটন ঃ
একটি মোবাইল ফোন, একটি অ্যাপ আর ইন্টারনেট—এই ত্রিমাত্রিক আসক্তির নাম এখন “ওয়ান লাইন” বা অনলাইন জুয়া। এতে বিভোর হয়ে পড়েছে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকেই একে বলছেন ‘আধুনিক দিনের সর্বনাশা ব্ল্যাকহোল’, যা নিঃশব্দে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভুক্তভোগী এক তরুণী গৃহবধূ জানান, “স্বামী টাকা দিলেই বলে—নেট প্যাক শেষ, কিছু অ্যাপ্লাই করতে হবে। কিছুদিন পর দেখি—বাসা বন্ধক, দেনা করে আরেকটা ‘লাইন’ কিনেছে। এখন আমার দুই বাচ্চা নিয়ে পিতার বাড়িতে আছি।”
এভাবে একটি পরিবারের মূল চালিকাশক্তি যখন এই ডিজিটাল জুয়ার ফাঁদে পড়ে, তখন শুধু সংসার নয়, একজন নারীর জীবনভর জমানো স্বপ্নও চুরমার হয়ে যায়। ময়মনসিংহ সহ সারাদেশে এমন হাজারো নারীর কান্না এখন নীরবে বয়ে চলেছে।
ময়মনসিংহ জেলা আদালতের অভিজ্ঞ আইনজীবী মাসুদ রানা বলেন, “গত দুই বছরে বিচ্ছেদের মামলায় জুয়াসংক্রান্ত অভিযোগ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আগে পরকীয়া, যৌতুক ছিল মূল কারণ; এখন বহু নারী অভিযোগ করছেন, স্বামী ‘ওয়ান লাইন’ জুয়ায় আসক্ত—সংসার চলে না, ঝগড়া লেগেই থাকে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনলাইন জুয়া এক ভয়ঙ্কর মানসিক আসক্তি তৈরি করে। তরুণ সমাজ এর সবচেয়ে বড় শিকার। স্মার্টফোন হাতে থাকা সন্তানেরাও এখন ‘সাইলেন্ট অ্যাডিক্ট’। অনেকে লোন নিচ্ছে, কেউ আত্মহত্যা করছে—এ যেন নীরব এক মহামারি।
‘ওয়ান লাইন’ জুয়ার চক্র শুরুতে কিছু ব্যবহারকারীকে ‘লাকি ইউজার’ বানিয়ে বড় অঙ্কের লাভ দেখায়। এতে আশায় বুক বাঁধে সাধারণ মানুষ। নিজের শেষ সম্বলটুকুও খুইয়ে শেষ পর্যন্ত তারা পড়ে যায় দেউলিয়াত্বের গভীরে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, “অনলাইন জুয়া কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, এটি মানসিকভাবে এক ভয়াবহ জাল। পরিবারে বিচ্ছিন্নতা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস এবং নারীর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে এটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার গোয়াতলা এলাকায় রয়েছে এই অনলাইন জুয়া চক্রের মূল হোতা। তারা বিভিন্ন সময়ে নতুন অ্যাপ, পেমেন্ট পদ্ধতি ও ভিন্ন নাম ব্যবহার করে ফের সক্রিয় হচ্ছে।
যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে কিছু হোস্টিং, অ্যাপ ও লেনদেন মাধ্যম বন্ধ করেছে, তবে চক্রটি বারবার ফিরে আসে। তাই কঠোর নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা এবং পরিবারের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া এ ব্যাধি থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।
“ওয়ান লাইন” অনলাইন জুয়া আজ শুধুই অর্থনৈতিক একটি সমস্যা নয়; এটি একটি বিস্তৃত সামাজিক সংকট। এই ছোবল থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন সর্বস্তরের উদ্যোগ—পরিবার থেকে প্রশাসন পর্যন্ত সবার মিলিত ও সচেতন ভূমিকা।


















