
স্টাফ রিপোর্টারঃ
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার কৈচাপুর মৌজার ৬০ শতাংশ পৈত্রিক জমিকে ঘিরে টানা ১৯ বছরের আইনি লড়াই, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও সামাজিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রমাণিত হয়েছে, বিতর্কিত ১৩১৩২ নং সাফ কবলা দলিলটি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করা হয়েছিল।
আদালতের নির্দেশে তদন্ত শেষে পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট মতামত দিয়েছে যে দলিলটি প্রতারণার আশ্রয়ে প্রস্তুত এবং এতে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৬৯ ও ৪৭১ ধারায় অপরাধের উপাদান বিদ্যমান। দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকা একটি দলিলের ভেতরের অসঙ্গতি উদঘাটনে এই তদন্ত নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, নালিশি জমির আর.ও.আর ও বি.আর.এস রেকর্ড অনুযায়ী প্রকৃত মালিক ছিলেন ইমন আলী মুন্সী। পৈত্রিক সূত্রে তার ছেলে আব্দুল গনি দীর্ঘদিন ধরে জমিটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখলে ছিলেন এবং কৃষিকাজ চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ১৯৮০ সালের ১৩ জুন নিবন্ধিত ১৩১৩২ নং একটি সাফ কবলা দলিলের ভিত্তিতে নেওয়াজ আলী মালিকানা দাবি করেন। অভিযোগ রয়েছে, উক্ত দলিলকে ভিত্তি করে ২০০৭ সালে তিনি তার স্বজনদের নিয়ে জমি দখলের চেষ্টা চালান। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়। বিভিন্ন সময়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও একাধিক ফৌজদারি ও দেওয়ানী মামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
দলিলটি বাতিলের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে মোঃ আব্দুল গনি বাদী হয়ে হালুয়াঘাট সহকারী জজ আদালতে ৯৪/২০১৩ নং মামলা দায়ের করা হয়। আদালতে মহাফেজখানার রেকর্ড কিপার সুরঞ্জিত সরকার সাক্ষ্য দিয়ে জানান, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের থাম বহিতে দলিলদাতার নামের স্থলে অন্য দুই ব্যক্তির নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা দলিলের সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। তবুও ওই মামলা খারিজ হলে বাদীপক্ষ জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। পরবর্তীতে আব্দুল গনির ছেলে আব্দুল মোতালেব বাদী হয়ে পৃথকভাবে ময়মনসিংহ সদর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জাল দলিল সংক্রান্ত একটি মামলা দায়ের করেন এবং বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য আদালত পিবিআইকে দায়িত্ব দেন।
পিবিআই, ময়মনসিংহ জেলা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে। পুলিশ সুপারের নির্দেশে তদন্তভার অর্পিত হয় ইন্সপেক্টর মুসলেউদ্দিনের ওপর। তিনি সংশ্লিষ্ট দলিল, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের থাম বহি, খতিয়ান, দাগ নম্বর, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। তদন্তে দেখা যায়, দলিলে দাতা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে মোঃ ইমান আলীর নাম; কিন্তু থাম বহিতে টিপসইয়ের পাশে দাতা হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে মোঃ ফজর আলী মন্ডল ও মোঃ আবেদ আলী মন্ডলের নাম। এই মৌলিক অসঙ্গতি দলিলের বৈধতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তদন্তে আরও উদঘাটিত হয় যে বাদীপক্ষের জমির খতিয়ান নং-৭৮৪ হলেও বিতর্কিত দলিলে উল্লেখ রয়েছে খতিয়ান নং-৮৮৪। দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণেও গরমিল পাওয়া যায়। এসব অসামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী কর্মকর্তা সুস্পষ্ট মত দেন যে দলিলটি প্রকৃত মালিকের অজ্ঞাতে ও প্রতারণার মাধ্যমে সৃজন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দলিল গ্রহীতা নেওয়াজ আলী ও তার ভাই আব্দুল হাই এর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৬৯ ও ৪৭১ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। বিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আদালত কে সুপারিশ করেন পিবিআই
ভুক্তভোগী আব্দুল গনি জানান, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও বিরোধের কারণে আর্থিকভাবে তারা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হন এবং মামলা পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, যার পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে হয়রানি, হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)এর হালুয়াঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি বাবুল হোসেন জানান, ভূমি সংক্রান্ত বিরোধে জাল দলিল সৃজন একটি পুরনো কৌশল হলেও দীর্ঘ ১৯ বছর একটি জাল দলিল কার্যকর থাকা বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রশ্ন উত্থাপন করে। তবে পিবিআইয়ের তদন্তে সুস্পষ্টভাবে অসঙ্গতি চিহ্নিত হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা প্রশংসিত হচ্ছে।
তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের পর এখন পুরো এলাকার নজর চূড়ান্ত রায়ের দিকে। ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচারের পূর্ণ বাস্তবায়ন, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজ।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আইনি লড়াই শেষে সত্য উদঘাটনের এই ঘটনা হালুয়াঘাটের ভূমি বিরোধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রতিপক্ষের লোকজন বাড়িতে না থাকায় তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না।


















