
আব্দুল হক লিটনঃ
মাত্র ৬৫ লাখ টাকার বালুমহালের ইজারাকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৫ শত কোটি টাকার সড়ক ও সেতু ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার নেতাই নদ থেকে বালু উত্তোলন ও অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাকে পরিবহনের কারণে হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও ফুলপুর উপজেলার বিভিন্ন সড়ক এখন ধ্বংসের পথে। কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। আবার কোথাও সড়কের দুই পাশ ভেঙে পড়েছে। এতে তিন উপজেলার লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানে প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন আপাতত বন্ধ থাকলেও থেমে নেই বালুর কারবার। কৌশল পাল্টে নৌকার ওপর ড্রেজার বসিয়ে গোপনে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। পরে অতিরিক্ত বোঝাই করে বিভিন্ন সড়ক দিয়ে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে একদিকে নদ থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ, অন্যদিকে ওভারলোড ট্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারি সড়ক।
নেতাই নদকে ঘিরে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কার্যক্রম দীর্ঘদিনের। এতে স্থানীয় সড়কের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুগুলোও ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ড্রেজার বন্ধ ঘোষণা করা হলেও নির্জন এলাকায় নৌকার ওপর ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। পরে রাত কিংবা ভোরে এসব বালু সরিয়ে নেওয়া হয়। গারো আদিবাসী অংকুর চিসিম বলেন, ড্রেজার বন্ধ হয়েছে কাগজে-কলমে। নদে গেলে নৌকার ওপর ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার দৃশ্য দেখা যায়। এ বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
নেতাই নদে ড্রেজার ব্যবহারের অনুমতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সালমান ওমর রুবেল। তার অভিযোগ, ৬০টি ড্রেজার ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে সেখানে ৩০০টির বেশি ড্রেজার বসানো হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘ফ্রি স্টাইলে লুটপাট করে সড়কের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে সরকারি সড়ক ও সেতু ধ্বংস করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সালমান ওমর রুবেল আরও বলেন, ১২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সীমান্ত সড়কও ধ্বংসের পথে। সরকারি সড়ক ও সেতু রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
নেতাই নদীর বালুমহালের ইজারাদার হিসেবে ত্রিশাল উপজেলা যুবলীগের সদস্য হারুন অর রশিদের নাম উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছেন সালমান ওমর রুবেল। তিনি বলেন, ‘ত্রিশালের যুবলীগের সদস্য হারুন অর রশিদ আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট। তার নামে একাধিক মামলা রয়েছে। এত মামলা থাকা অবস্থায় বর্তমান সরকারের আমলে সে কীভাবে হাইকোর্ট থেকে বালু উত্তোলনের ইজারা পায়?’
তিনি আরও বলেন, তাকে কে সহযোগিতা করেছে বা সেল্টার দিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। মাত্র ৬৫ লাখ টাকার ইজারার জন্য সরকারি হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শাকুয়াই বাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বালু বোঝাই ট্রাক চলাচল করছে। এসব ট্রাকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে চালকরা বিভিন্ন ঘাটে টাকা দেওয়ার কথা বলেন। ‘ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিয়ে এ রাস্তা দিয়ে চলি’—এমন কথাও তারা প্রায়ই শুনতে পান বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
শাকুয়াই বাজারের বিভিন্ন স্থানে সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে গর্তগুলো আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাঝে মধ্যেই যানবাহন আটকে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গোয়াতলা ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিকল্প পথে ভারী যানবাহনের চাপ বেড়েছে। বালু ও পাথরবোঝাই বড় ট্রাক এখন বিকল্প সড়ক ব্যবহার করছে।
গোয়াতলা থেকে ফুটকাই ব্রিজ হয়ে শাকুয়াই বাজার, সেখান থেকে নাগলা বাজার পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সড়কে এর প্রভাব বেশি পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আগে সীমিত যানবাহন চলাচল করলেও এখন প্রতিদিন ভারী ট্রাক চলাচল করায় অল্প সময়েই সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফুটকাই নদীর ওপরের ব্রিজটিও ঝুঁকিতে পড়েছে। ব্রিজের অ্যাপ্রোচ দেবে গেছে এবং এক পাশে ফাটল দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাক চলাচল অব্যাহত থাকলে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ বলেন, ধোবাউড়ার নেতাই নদী থেকে অতিরিক্ত বালু বোঝাই করে নেওয়ার সময় বেশ কয়েকটি ট্রাক আটক করে জরিমানা করা হয়েছে। তবে গভীর রাতে সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত বালু বোঝাই ট্রাক চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, নেতাই নদ থেকে বালু উত্তোলন আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে ওভারলোডের কারণে হালুয়াঘাটের বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিয়ম ভেঙে বালু উত্তোলন বা অতিরিক্ত বোঝাই করে বালু পরিবহন করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নৌকার ওপর ড্রেজার বসিয়ে গোপনে বালু উত্তোলনের অভিযোগে আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত নদে অভিযান দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খঃ মোঃ শরিফুল আলম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো একাধিকবার সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযানও চালানো হয়েছে। অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহন চলাচল বন্ধে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।
তারা জানান, সড়কের ওপর অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করা না গেলে নতুন করে সড়ক সংস্কার করেও দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া কঠিন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে বালু ও পাথরবোঝাই ওভারলোড ট্রাক চলতে থাকলে একসময় এসব সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে তিন উপজেলার লাখো মানুষকে আরও দুর্ভোগে পড়তে হবে।
তাদের দাবি, শুধু বালু উত্তোলন বন্ধ করলেই হবে না; নৌকার ওপর বসানো ড্রেজার বন্ধ, ওভারলোড ট্রাক নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত ওজন নিশ্চিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর জরুরি সংস্কার করতে হবে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, ৬৫ লাখ টাকার একটি বালুমহাল থেকে সরকারের রাজস্ব এলেও সেই বালু উত্তোলন ও পরিবহনে যদি তার চেয়ে বহুগুণ মূল্যের সরকারি সড়ক-সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এ ক্ষতির দায় কার?
স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যক্তিস্বার্থে সরকারি সম্পদ ধ্বংসের এ প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। আর সেই ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ মানুষের।
Bijoy71 TV Bijoy71 TV