
আব্দুল হক লিটন ঃ
আব্বুর কোলে ঘুম আসছিল না ছোট্ট আইয়ুবের। হয়তো ভেবেছিল, একটু পরে মা এসে আদরে ভরিয়ে দেবে। কিন্তু কে জানত, সেই ‘আব্বু’র কোলই হয়ে উঠবে মৃত্যুর পথ! ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে ঘটে গেছে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা—নিজ হাতে নিজের দুই বছরের ছেলেকে হত্যা করে ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখেন এক পিতা।
নিহত শিশুর নাম আইয়ুব আলী। বয়স মাত্র ২ বছর। আর অভিযুক্ত পিতা নুরুল আমিন (৩০), যাকে পরিবার ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলে দাবি করেছে।
বুধবার (১৮ জুন) দুপুরে হালুয়াঘাট উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের পশ্চিম ধুরাইল গ্রামে ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত এ ঘটনা।
দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যায় ভোগা নুরুল আমিন সেদিন হঠাৎই তার শিশু সন্তানকে কোলে তুলে নেন। প্রথমে পরিবারের কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, তিনি দা হাতে পরিবারের অন্য সদস্যদের ভয় দেখিয়ে ঘরের দরজা আটকে দেন। আতঙ্কে সবাই ঘর ছেড়ে পালায়।
সন্ধ্যার দিকে স্থানীয়দের সহায়তায় পরিবারের লোকজন ঘরে প্রবেশ করে খোঁজ শুরু করে শিশুটির। পিতা নুরুল আমিন জানায়, “আমি জানি না, কোথায় গেছে আইয়ুব।” কিন্তু ঘরের এক কোণে সদ্য খোঁড়া মাটির স্তূপ থেকে রহস্যের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
তীব্র প্রশ্নে অবশেষে নুরুল আমিন ভেঙে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে স্বীকার করে—ছেলেকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করেছেন এবং ঘরের মেঝেতে পুঁতে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, হত্যার পর দুটি ছাগল জবাই করে সেগুলোও একই গর্তে পুঁতে রাখেন তিনি।
আইয়ুবের দাদা ফজুল মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
“আমার নাতিটা হাসিখুশি ছিল। কিছুদিন আগেই হাঁটতে শিখেছে। আমার ছেলে মানসিক রোগী, কিন্তু সে যে এমন করবে, জানতাম না। আমি বাড়িতে ছিলাম না। এসে দেখি—সব শেষ…”
পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে গর্ত খুঁড়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং হত্যায় ব্যবহৃত কোদাল ও শাবল জব্দ করে। অভিযুক্ত পিতাকেও আটক করা হয়।
ঘটনার বিষয়ে হালুয়াঘাট সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সাগর সরকার জানান,
“মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্ত পিতাকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মানসিক রোগের বিষয়টি সামনে আসলেও তদন্ত চলছে।”
ঘটনার পর পুরো গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ভার। চোখে পানি, মুখে প্রশ্ন—একজন মানসিক রোগী কেন পরিবারের নজরদারির বাইরে ছিল? কেন তার হাতেই ছিল শিশুর জীবন?
স্থানীয় একজন শিক্ষক বলেন,
“এই শিশুটিকে আমরা রোজ হাসতে দেখতাম। পাড়ার সবার আদরের ছিল। এখন মনে হয়, আমরা সবাই ব্যর্থ। সমাজ হিসেবে, পরিবার হিসেবে।”
আইয়ুব এখন নেই। নেই তার হাঁটতে শেখা পায়ের ছাপ, নেই মায়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়া মুখখানা। তাকে ঘিরে যে পৃথিবীটা সাজানো হচ্ছিল, সেটিই আজ হয়ে গেছে নিরব, নিস্তব্ধ, কবরের মতো শীতল।
এই একটি ঘটনা কেবল আইয়ুবের মৃত্যুই নয়, এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার সামনে এক নির্মম আঙুল তুলেছে। মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক নজরদারি এবং সহানুভূতির ঘাটতি—সব মিলেই এক নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে গেছে।
আর যেন কোনো শিশুর মৃত্যু না হয় নিজের বাবার হাতেই—এমনই প্রত্যাশা এখন হালুয়াঘাটবাসীর।
Bijoy71 TV Bijoy71 TV