পদক্ষেপে” জমা ব্ল্যাংক চেক জামিনদারের হাতে, ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে ১০ লাখের মামলা

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

ঋণ মাত্র দেড় লাখ টাকা। অথচ সেই ঋণের সময় দেওয়া স্বাক্ষর করা ব্ল্যাংক চেকেই উঠেছে ১০ লাখ টাকার দাবি। আরও বিস্ময়কর, ঋণ নেওয়ার সময় পদক্ষেপ এনজিওতে জমা দেওয়া দুটি চেকের একটির হদিস মিলছে জামিনদার আরিফুল ইসলামের হাতে। পরে সেই চেক ব্যবহার করেই ঋণগ্রহীতা জুবেদা খাতুনের বিরুদ্ধে করা হয়েছে ১০ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলা। ঘটনাটি ঘিরে এখন প্রশ্নের পর প্রশ্ন, দেড় লাখ টাকার ঋণ কীভাবে ১০ লাখে পৌঁছাল, আর এনজিওতে জমা দেওয়া ব্ল্যাংক চেক জামিনদারের হাতে গেলই বা কীভাবে?

ময়মনসিংহের তারাকান্দার এ ঘটনায় জুবেদা খাতুনের বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, পূর্বের কর্জের টাকা পরিশোধের জন্য ১০ লাখ টাকার একটি চেক দেওয়া হয়। পরে একাউন্টে টাকা না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হলে আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়েও টাকা পরিশোধ না করায় আদালতে মামলা করা হয়েছে।

তবে মামলার এই বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি ভিন্ন দাবি জুবেদা খাতুনের। তার পরিবারের অভিযোগ, আরিফুল ইসলামের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কিছু টাকা-পয়সার লেনদেন থাকলেও তাকে ১০ লাখ টাকার কোনো চেক দেওয়া হয়নি। বরং পদক্ষেপ এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার সময় জামিনদার হিসেবে আরিফুল ইসলাম ছিলেন এবং ঋণের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে দুটি স্বাক্ষর করা চেক দেওয়া হয়েছিল।

পরিবারটির দাবি, দুটি চেকের একটি এনজিওর কাছে থাকার কথা থাকলেও অপর চেকটি কীভাবে আরিফুল ইসলামের হাতে গেল, সেটিই এখন মূল রহস্য। তাদের অভিযোগ, ঋণের টাকা উত্তোলনের দিনই দেড় লাখ টাকা নিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়। পরে ওই চেকের পাতা ব্যবহার করে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হয়েছে। সেখানে প্রথমে দেড় লাখ, পরে দুই লাখ এবং একপর্যায়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করার অভিযোগ ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, চেকটি নিয়ে দরকষাকষির ঘটনাও ঘটেছে।

এখানেই শেষ নয়। অভিযোগের তীর উঠেছে পদক্ষেপ এনজিওর দিকেও। কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যেই উঠে এসেছে—ঋণ দেওয়ার সময় দুটি চেক নেওয়া হয়েছিল এবং একটি চেক ফেরত দেওয়া হয়েছে। তাহলে ফেরত দেওয়া সেই চেকটি কার হাতে গেছে? ফেরতের সময় কি কোনো রসিদ নেওয়া হয়েছিল? চেক নম্বর কি ঋণ নথিতে সংরক্ষিত ছিল?

See also  জামায়াত ভোটে ভয় পায়, নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত — এমরান সালেহ প্রিন্স

পদক্ষেপের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান মুঠোফোনে বলেন, জুবেদা খাতুনকে তাদের অফিস থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল এবং আরিফুল ইসলাম ছিলেন জামিনদার। তাদের কাছে দুটি চেক নেওয়া হয়েছিল এবং একটি চেক ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য চেকটি কীভাবে আরিফুল ইসলামের হাতে গেল, তা তাদের জানা নেই।

এ বক্তব্যই ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ একটি চেক যদি এনজিওর কাছে থাকার কথা থাকে এবং অন্যটি ফেরত দেওয়া হয়, তাহলে সেই ফেরত দেওয়া চেকের বর্তমান মালিকানা ও ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। বিশেষ করে সেই চেকেই যদি ১০ লাখ টাকার দাবি তোলা হয়, তাহলে চেকটি কখন, কোথায় এবং কার উপস্থিতিতে পূরণ করা হয়েছে, তার উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে আরিফুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘মায়ের চেক যদি সন্তান দিয়ে যায়, তাহলে আমার কী করার থাকে।’ তার দাবি, বিষয়টি মীমাংসার জন্য তিনি একপর্যায়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আপস করতে চেয়েছিলেন। পরে স্থানীয় কিছু লোকের ইন্ধনে টাকার অঙ্ক বাড়তে থাকে। চেকটি সংগ্রহ করতে তার তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—চেকটি যদি বৈধভাবে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে পাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হলো? এনজিওর ঋণ নথিতে চেকটির কোনো উল্লেখ আছে কি না? চেকটি ফেরত দেওয়ার প্রমাণ কী? আর দেড় লাখ টাকার ঋণের সঙ্গে ১০ লাখ টাকার দাবির সম্পর্ক কী?

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার দরবার-সালিশ হয়েছে। সেখানে প্রায় শতাধিক মানুষের গণস্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের বক্তব্য, ঋণ নেওয়ার সময় দুটি চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল এবং একটি চেক জামিনদারের কাছে থাকার বিষয়টি তারা সালিশে জানতে পারেন।

অন্যদিকে অনুসন্ধানের সময় পদক্ষেপের শ্যামগঞ্জ শাখায় গিয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। পরে কর্মকর্তা অফিসে উপস্থিত হলে তার পাশে স্থানীয় দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিকে দেখা যায়। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ক্যামেরা সামনে আসার পর তারা সরে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

See also  ভালুকায় পৌরসভা সদর ক্লাস্টার কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কমিটি গঠন"

সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন শুধু একটি চেক ডিজঅনার মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামনে এসেছে ঋণের অঙ্ক, ব্ল্যাংক চেক, জামিনদারের হাতে চেক যাওয়ার অভিযোগ এবং সেই চেকে ১০ লাখ টাকার মামলা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

দেড় লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে ১০ লাখ টাকার চেক—এই অঙ্কের ব্যবধানই এখন পুরো ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। চেকটি আসলে কার কাছে থাকার কথা ছিল, কীভাবে জামিনদারের হাতে গেল এবং ১০ লাখ টাকার অঙ্কটি কখন লেখা হলো, এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট নথি ও ব্যাংক রেকর্ড যাচাই করলেই।

তবে এই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র রয়েছে পদক্ষেপের শাখা কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজে। দেড় লাখ টাকার ঋণ উত্তোলনের সময় জুবেদা খাতুন ও জামিনদার আরিফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন কি না, সেই সময়ে ঠিক কয়টি চেক স্বাক্ষর করে দেওয়া হয়েছিল এবং চেকগুলো কার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় সিসিটিভি ফুটেজে যাচাই করা সম্ভব। ঋণ উত্তোলনের দিনের ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা গেলে জুবেদা খাতুনের দাবি কতটা সত্য, তিনি দোষী না নির্দোষ—এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মিলতে পারে। একই সঙ্গে চেকের হেফাজত ও পরবর্তী ব্যবহারের বিষয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোরও অনেকটাই অবসান হতে পারে।

অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়। তবে তার আগেই একটি বিষয় স্পষ্ট, একটি ব্ল্যাংক চেকের যাত্রাপথ নিয়ে এত প্রশ্ন তৈরি হলে সেই চেকের উৎস, হেফাজত ও ব্যবহার নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। আর ঋণ উত্তোলনের দিনের সিসিটিভি ফুটেজ, ঋণের নথি, চেকের তথ্য ও ব্যাংক রেকর্ড—এই চারটি বিষয় যাচাই করা গেলে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে। কারণ দেড় লাখ টাকার ঋণের কাগজ যদি শেষ পর্যন্ত ১০ লাখ টাকার মামলায় পরিণত হয়, তাহলে এর নেপথ্যের পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

About Abdul Hoque Liton

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share with