
আব্দুল হক লিটন হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
ছোটবেলা থেকেই গরু-পালনের অভিজ্ঞতা ছিল আব্দুল কাইয়ুমের। তবে সময়ের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে রূপ নেয় অপরাধে। নিজের তিনটি পিকআপ গাড়িকে ব্যবহার করে রাতের আঁধারে বিভিন্ন গ্রাম ও বাজার থেকে গরু চুরি করে তা পাচার করতেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। একসময় গরু চুরি আর ডাকাতিতে কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠা এই কাইয়ুম এখন পুলিশে হাতে গ্রেফতার।
গত ৬ জুন, বৃহস্পতিবার ভোর রাতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার লামুক্তা গ্রামে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে কাইয়ুমকে গ্রেফতার করে থানা পুলিশ। তাকে গ্রেফতারের সময় তার বাড়ির দুইটি গোয়ালঘর থেকে উদ্ধার করা হয় ৮টি বড় গরু ও ২টি বাছুরসহ মোট ১০টি চোরাই গরু।
লামুক্তা গ্রামের আব্দুর রহিম জানান, দীর্ঘদিন ধরেই কাইয়ুমের বিরুদ্ধে গরু চুরি, ছাগল চুরি, এমনকি ডাকাতির অভিযোগ চলছিল। রাত গভীর হলে তার তিনটি পিকআপে গরু তোলা হতো। কখনো নিজ গ্রাম থেকে, কখনো আশপাশের এলাকা কিংবা দূরের জেলার হাটবাজার থেকে চুরি করে আনা গরুগুলো রাখা হতো তার গোপন গোয়ালঘরে।
গ্রেফতারের পর পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঢাকা মহানগরসহ অন্তত পাঁচ জেলার একাধিক থানায় কাইয়ুমের বিরুদ্ধে রয়েছে ১২টি চুরি-ডাকাতির মামলা। শুধু তাই নয়, কিছু মামলায় রয়েছে ‘খুন ও ডাকাতি’র মতো গুরুতর অভিযোগও।
হালুয়াঘাট থানার পুলিশ পরিদর্শক শুভ্র সাহা জানায়, কাইয়ুমের মালিকানাধীন তিনটি পিকআপ গাড়ি দিয়ে গরু পাচার করতেন তিনি। এর মধ্যে একটি পিকআপ বর্তমানে জামালপুর জেলার নারায়ণপুর তদন্ত কেন্দ্রে আটক রয়েছে। অন্য দুটি ব্যবহৃত হতো গোপনভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চুরি করা গরু স্থানান্তরে।
তিনি আরো জানান, সিডিএমএস দেখে নিশ্চিত হই যে, জামালপুর সদর থানার ৩টি মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট রয়েছে। টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ভালুকা, ঈশ্বরগঞ্জ, ফুলবাড়ীয়া, ডিএমপির শেরেবাংলা নগর ও উত্তরখান থানায় রয়েছে আরও ৯টি মামলা
অভিযোগের যার ধরন ৩৯৫/৩৯৭/৪১২/৪১১/৪১৩/৪৫৭/৩৮০/৩০২/২০১/৩৪ ধারাসহ গুরুতর অপরাধ।
হালুয়াঘাট ধোবাউড়া সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার সাগর বিশ্বাস জানান, আসামি আব্দুল কাইয়ুমের নামে মোট ১২টি মামলার তথ্য সিডিএমএসে মিলেছে। তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১০টি গরু উদ্ধার করা হয়। সে মূলত গরু চুরি ও পাচারে সক্রিয় ছিল। চোরাই গরুর চালান রুটসহ আমরা তদন্ত করছি। গ্রেফতারের পর কাইয়ুমকে হালুয়াঘাট থানায় নিয়ে আসা হয় এবং আদালতে পাঠানো হয়েছে। গরু চুরির ঘটনায় অধিকতর তদন্ত চলছে। উদ্ধারকৃত গরুগুলোর প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করে ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কাইয়ুমের ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ অনেকেই তবে স্থানীয়রা জানায় কাইয়ুমের গ্রামের বাড়িতে কালার টিনের বেষ্টনি দিয়ে একটি নান্দনিক বাড়ি, জমি, দামী গবাদিপশু এবং যানবাহনের মালিকানা রয়েছে। তার আয় ও সম্পদের উৎস নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছিল বহুদিন ধরেই।
উপযুক্ত কাইয়ুমের স্ত্রী বলছেন, তার স্বামী বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এটা সত্য। তবে যে গরুগুলো থানায় নেওয়া হয়েছে তা নিজস্ব টাকার কেনা। পুলিশ অহেতুক তাদেরকে হয়রানি করছে।
কাদের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠল কাইয়ুম? সমস্ত তথ্য উঠে এসেছে বিজয় ৭১ টিভি এর অনুসন্ধানে। দেখা গেছে, প্রতিটি মামলার পর কাইয়ুম কিছুদিন আত্মগোপনে থাকত। তারপর আবার ফিরে এসে পুরনো কৌশলে শুরু করত অপরাধ। কেউ কেউ মনে করেন, কোনো একটি প্রভাবশালী চক্র তাকে নিরাপত্তা দিত। প্রশ্ন উঠেছে, কিভাবে এতগুলো মামলা থাকা অবস্থায় সে এতদিন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকল?
নাগরিক সমাজ বলছেন, যেখানে এতগুলো মামলা রয়েছে, সেখানে সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা, আয়কর যাচাই, সম্পত্তির উৎস ও ব্যবহৃত যানবাহনের মালিকানা যাচাই করা উচিত। প্রশাসনের কাছে দাবি—চোরাই সম্পদের হিসাব নিয়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।


















