
ময়মনসিংহের ফুলপুর-তারাকান্দা অঞ্চলে বিএনপির রাজনীতি একসময় ত্যাগ, সংগ্রাম ও আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে শক্ত ভিত তৈরি করেছিল। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলের নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে ১৯৮৭ সালের ২৬ অক্টোবর দেশব্যাপী উপজেলা কর্মসূচির দিনে ফুলপুরে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে এক গভীর দাগ কেটে যায়। সে সময় ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে একমাত্র ফুলপুর উপজেলাতেই একটি মামলা দায়ের হয়, যেখানে ২৬ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়।
এই মামলায় উল্লেখযোগ্য কয়েকজন শীর্ষ নেতার পাশাপাশি একজন তৃণমূল কর্মীও আসামি হন, যিনি এফআইআর-এর ৩ নম্বর কলামে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ ৫ মাস ১৭ দিন কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। সেই সময়ের এই অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং পুরো অঞ্চলের বিএনপির সংগ্রামী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সভাপতি মরহুম আশরাফ সরকারের মৃত্যুতে ফুলপুর উপজেলা বিএনপি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। দলীয় কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে এবং তৃণমূল পর্যায়ে এক ধরনের হতাশা বিরাজ করতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে জেলা পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশনায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়ে একটি সভার আয়োজন করেন। সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সর্বসম্মতিক্রমে নতুন নেতৃত্ব গঠিত হয় এবং দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় সেই ত্যাগী নেতার হাতে, যিনি আগে আন্দোলন-সংগ্রামে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।
তার নেতৃত্বে সংগঠন পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায়।
দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা, তৃণমূলকে সক্রিয় করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নতুন গতি আনার মাধ্যমে ফুলপুর-তারাকান্দায় বিএনপি আবারও দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রথম বিজয় অর্জিত হয়, যা স্থানীয় বিএনপির জন্য একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত।
তবে এই সাফল্যের পরপরই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই সেই সভাপতিকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিতে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। দলীয় ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, নেতৃত্বের মূল্যায়ন এবং ত্যাগী কর্মীদের প্রতি আচরণ—এসব নিয়ে তখন থেকেই বিতর্ক শুরু হয়।
এরপরও তিনি দল থেকে সরে যাননি। বরং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সংগঠনের জন্য কাজ করে গেছেন। ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা বঞ্চনাকে প্রাধান্য না দিয়ে তিনি দলীয় আদর্শকে সামনে রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে জানা যায়।
স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, কর্মীদের সংগঠিত করা এবং দলীয় অবস্থান শক্তিশালী করতে তিনি ভূমিকা রাখেন।
কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে সেই চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বিএনপির ভেতরে এখন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের চেয়ে সুবিধাবাদী ও প্রভাবশালীদের প্রাধান্য বেড়েছে—এমন মন্তব্য করছেন তৃণমূলের অনেকেই। দলীয় পদ-পদবী ও প্রভাবের ক্ষেত্রে আদর্শিক অবস্থানের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিনের কর্মীরা মনে করছেন, যারা আন্দোলনের সময় রাজপথে ছিলেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তাদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বরং নতুন করে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা একটি গোষ্ঠী দলীয় কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করছে, যা সংগঠনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট নেতা নিজেও এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসার কথা তুলে ধরেছেন। তার প্রশ্ন—যে বিএনপি ত্যাগ, আদর্শ ও সংগ্রামের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল, আজকের এই বিএনপি কি সেই একই আদর্শ ধারণ করে? ফুলপুর-তারাকান্দায় তিনি যে সংগঠন রেখে গিয়েছিলেন, সেটি কি আজও সেই পথে আছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান, এ ধরনের সংকট কেবল একটি উপজেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় রাজনীতিতে একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব, নেতৃত্বের মূল্যায়নে অসামঞ্জস্য এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল, এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, অতীতের ত্যাগ ও অবদানকে সামনে এনে সংগঠনকে পুনর্গঠন করা জরুরি। যারা কঠিন সময়ে দলকে ধরে রেখেছেন, তাদের মূল্যায়ন না করলে দলীয় ঐক্য ও শক্তি ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
সব মিলিয়ে, ফুলপুর বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, ত্যাগের রাজনীতি থেকে সরে এসে যদি স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রাধান্য পায়, তবে সংগঠনের মূল ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই সময় এসেছে আত্মসমালোচনার, সময় এসেছে আদর্শে ফিরে যাওয়ার,এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।






















