নতুন কুঁড়ি: শেকড়ের টানে নতুন প্রজন্ম

মোঃ আব্দুল হক লিটনঃ

ময়মনসিংহ, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫:
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’—এক নামেই স্মৃতি জড়িয়ে আছে একাধিক প্রজন্মের। আশির দশকে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠান বহু শিল্পীকে উপহার দিয়েছে জাতীয় অঙ্গনকে, যারা আজ বাংলাদেশের গান, অভিনয়, নৃত্য, আবৃত্তি ও সংস্কৃতির শীর্ষ আসনে প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন আঙ্গিকে শুরু হওয়া ‘নতুন কুঁড়ি-২০২৫’ ইতোমধ্যেই সাড়া ফেলেছে সারা দেশে। এবারের প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত হলো বিশেষ প্রচার কৌশল সভা।

১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম সম্প্রচার হয় শিশু-কিশোরদের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’। গান, নাচ, আবৃত্তি, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন,সব ক্ষেত্রেই নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার এই আয়োজন একসময় হয়ে উঠেছিল দেশের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষ এখনও স্মরণ করেন, কীভাবে প্রতি বছর ‘নতুন কুঁড়ি’ পরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করত। তখনকার দিনে ছোট্ট প্রতিযোগীদের সাদা-কালো পর্দায় দেখতে বসে যেত পুরো পরিবার।

‘নতুন কুঁড়ি’র মঞ্চ থেকেই জাতীয় অঙ্গনে উজ্জ্বল হয়েছেন অনেক খ্যাতিমান শিল্পী।

অভিনেত্রী শমী কায়সার, অভিনয়ের প্রথম স্বীকৃতি পেয়েছিলেন এই আসর থেকেই। পরে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের নাট্যাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

কণ্ঠশিল্পী মেহরীন, নতুন কুঁড়ি’র মঞ্চে গান গেয়ে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে তিনি আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

অভিনেত্রী বিজরী বরকতউল্লাহ, শৈশবেই ‘নতুন কুঁড়ি’র আলোচনায় আসেন, পরে নাটক-সিনেমায় ব্যাপক সাফল্য পান।

অভিনেত্রী কণ্ঠশিল্পী ফারিহা পারভীন, শিল্পকলার নানা শাখায় তার পরিচিতি তৈরি হয় এই আয়োজন থেকেই।

আবৃত্তি, নৃত্য ও চিত্রাঙ্কনের অনেক প্রতিভাই আজ দেশের শিল্পক্ষেত্রে সুপরিচিত, যাদের শুরু হয়েছিল এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই।

অর্থাৎ, একসময়কার ছোট্ট শিশু শিল্পীরা আজ হয়ে উঠেছেন দেশের সংস্কৃতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের পথচলার মূল সূচনা হয়েছিল ‘নতুন কুঁড়ি’র মঞ্চে।

ময়মনসিংহ অঞ্চল বরাবরই সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য বিখ্যাত। ময়মনসিংহ গীতিকা, যাত্রা, পালাগান, ভাটিয়ালি, এসব গ্রামীণ শিল্পধারার সাথে এখানকার মানুষ বেড়ে ওঠে। শিশু-কিশোরদের ভেতরেও এই শিল্পচর্চার প্রবণতা প্রবল।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করেন, এই অঞ্চলের শিশু-কিশোররা যদি জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পায়, তাহলে তারা দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারবে।

এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার বিকেলে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ প্রচার কৌশল সভা। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নির্বাহী ও ‘নতুন কুঁড়ি’ ময়মনসিংহ-১ (ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর) অঞ্চল ও বিভাগীয় অডিশন কমিটির আহ্বায়ক মঈনুর রহমান মোল্লা। এসময় তিনি বলেন, নতুন কুঁড়ি কেবল একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির ধারক-বাহক। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শিল্প-সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এবারের প্রতিযোগিতার আবেদন সময়সীমা ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। আশা করছি, ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে ব্যাপক সাড়া মিলবে।”

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রচারের জন্য বিশেষ কিছু কৌশল নেওয়া হবে, বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাভিত্তিক প্রচারণা, স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় সম্পৃক্ততা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা জোরদার।

অতীতে যারা নতুন কুঁড়ির মঞ্চে উঠেছেন, তাদের অনেকেই আজ স্বপ্ন পূরণের পথিকৃত। শিশু অবস্থায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অনেকেই আজ জাতীয় পর্যায়ের শিল্পী।

একজন প্রাক্তন প্রতিযোগী স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“নতুন কুঁড়ি আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। ছোটবেলায় সেই মঞ্চে দাঁড়ানোই আজকের আমি হয়ে ওঠার বড় অনুপ্রেরণা।

এবারের প্রতিযোগিতায়ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশু-কিশোররা স্বপ্ন বুনছে। অনেকেই ইতোমধ্যেই আবেদন করেছে, আবার সময়সীমা বাড়ায় আরও অনেকেই সুযোগ পাচ্ছে।

সভায় অংশ নেন—ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকবৃন্দ, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও জেলা তথ্য অফিসের কর্মকর্তা, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের প্রতিনিধি,শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা, শিশু ও শিল্পকলা একাডেমীর কর্মকর্তা, বিটিভি সদর দপ্তরের উপপরিচালক (নিরাপত্তা) ও ময়মনসিংহ-২ (জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল) আঞ্চলিক অডিশন কমিটির আহ্বায়ক তামিমা সুলতানা, অনুষ্ঠান প্রযোজক হাসান রিয়াদসহ স্থানীয় গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রতিনিধিবৃন্দ।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে এই ধরনের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কার্যকর। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে যখন শিশুরা মোবাইল-গেম ও ভার্চুয়াল জগতে ব্যস্ত, তখন নতুন কুঁড়ির মতো অনুষ্ঠান তাদের শিকড়ের সাথে যুক্ত করে, দেয় সৃজনশীলতার পথ।

একজন সাংস্কৃতিক কর্মীর ভাষায়,
“নতুন কুঁড়ি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি আন্দোলন, যা শিশু-কিশোরদের সংস্কৃতিমুখী করে এবং সমাজকে দেয় আলোকিত প্রজন্ম।”

সভায় আলোচকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, নতুন কুঁড়ি-২০২৫’ হবে নতুন প্রজন্মের প্রতিভা বিকাশের এক ঐতিহাসিক আয়োজন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ এ আয়োজনকে করবে আরও বর্ণময়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *