
মোঃ আব্দুল হক লিটনঃ
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের নামে পুলিশের অভিযানে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পাশাপাশি তার খামার থেকে ১০টি গরু জব্দ করা হয়। কিন্তু জব্দের পর খাবার-দাবার ও যথাযথ পরিচর্যার ঘাটতিতে এ পর্যন্ত মারা গেছে তিনটি গরু। বাকিগুলোও মারাত্মক অসুস্থ। এ ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।
চলতি বছরের ৬ জুন গভীর রাতে হালুয়াঘাট থানার ওসি হাফিজুল ইসলাম হারুনের নির্দেশে এসআই শুভ্র সাহার নেতৃত্বে দলবল নিয়ে গ্রেপ্তারি অভিযান চালানো হয় আব্দুল কাইয়ুমের বাড়িতে। তাকে গ্রেপ্তার করার পর তার খামার থেকে ১০টি গরু ও ২টি বাছুর জব্দ করে পুলিশ।
প্রথমে গরুগুলো থানায় রাখা হয়। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তির খামারে সরিয়ে নেওয়া হয় অসুস্থ অবস্থায়। তবে,কেউই খাবার-দাবার বা চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করেনি। শুধু তাই নয়, এর আগেও একই পরিবারকে পুলিশি ‘জব্দ’ প্রক্রিয়ায় বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল।
কাইয়ুমের মা, আমেনা খাতুন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, দুই বছর আগেও পুলিশ গরুগুলো থানায় নিয়েছিল, তিন লাখ টাকা দিয়ে ছাড়াতে হয়েছিল। এবার আবার টাকা দাবি করছে পাঁচ লাখ। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় জোর করে পিকআপে তুলে নিয়ে গেল। এখন তিনটা গরু মারা গেল, আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আমার সন্তানের লেখাপড়া, শশুর শাশুড়ি নিয়ে চলার পথ বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। আমি বিচার প্রার্থী, অপরাধ আমার স্বামী করেছে, তাকে গ্রেফতারও করেছে। কিন্তু আমার খামারে প্রায় পাঁচ বছরও বেশি সময় ধরে লালন পালন করা গরু গুলো নিয়ে গেল পুলিশ, আমি তদন্তের মাধ্যমে বিচার কামনা করছি।
স্থানীয়দের জানান, এ গরুগুলো দীর্ঘদিন ধরে খামারে লালন-পালন করা হচ্ছিল। হঠাৎ করে এগুলোকে চোরাই বলে দাবি করায় তারা ক্ষুব্ধ। ইব্রাহিম নামের এক ব্যক্তি জানান,
“আমি কাইয়ুমের কাছে একটি গরু বিক্রি করেছিলাম। টাকা দেওয়ার আগের দিনই গ্রেপ্তার হলেন। এখনো টাকা পরিশোধ হয়নি। গরুগুলো আমাদের সামনে থেকেই লালন-পালন হতো। এগুলো চোরাই কিভাবে হয়?
গ্রামের আরো কয়েকজন বলেন, পুলিশ শুধু আসামি ধরেনি, গরুগুলোও তুলে নিয়ে গেছে। আমাদের কথা শোনেনি। আমরা একাধিকবার চেষ্টা করেছি কাইয়ুমের বাড়িতে প্রবেশ করে পুলিশকে সত্য ঘটনা বলতে। কিন্তু পুলিশ উত্তেজিত হয়ে আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করেন এবং আমাদের কোন কথাই শুনতে রাজি হয়নি তারা।
থানার ওসি হাফিজুল ইসলাম হারুন এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি না হলেও, মুঠোফোনে এসআই শুভ্র সাহা বলেন, কাইয়ুম একাধিক মামলার আসামি। চোরাই গরু সন্দেহে গরুগুলো জব্দ করেছি। বর্তমান মামলার তদন্তকর্মকর্তা এসআই টিটু বলেন, গরু গুলো জব্দ করার পর থেকে খাবার ও চিকিৎসার দায়িত্ব আমি নিজেই চালিয়ে যাচ্ছি।
তবে জব্দকৃত গরু তিনটি মারা যাওয়ার তথ্য সম্পর্কে তিনি সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
গরুর মৃত্যু ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরে কুলসুম বেগম বলেন, গরুগুলো থানায় নেওয়ার পর পুলিশ আমাকেই খাবার দিতে বলেছে। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার বাড়ি থেকে থানা ৫–৭ কিলোমিটার দূরে। আমি প্রতিদিন যেতে পারি না। আর তাই তিনটা গরু মারা গেল। আমার সব শেষ হয়ে গেল। তিনি অভিযোগ করেন,
জব্দের দিন পুলিশ তাদের ঘর থেকে বেরোতে দেয়নি, কোনো নথিপত্র দেখায়নি, এমনকি অসুস্থ গরুগুলোর চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেনি তারা। আমরা গরুগুলির কাগজপত্র দেখিয়েছি আমাদের কাগজপত্র পুলিশ ছিড়ে ফেলে দিয়েছে। মোবাইলে যা ছিল তা আমরা ফটোকপি করে আদালতে সাবমিট করেছি।
ময়মনসিংহ জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব ডঃ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনে কোথাও নেই যে আসামির স্ত্রী বা পরিবারের সম্পদ জব্দ করা যাবে অভিযোগ প্রমাণের আগেই। জব্দ করতে হলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রয়োজন। এখানে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়নি। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ এই গরুগুলোর মালিক দাবি করেনি। তাই পুলিশ চোরাই সন্দেহ দেখিয়ে গরু জব্দ করেছে, এটা আইনগতভাবে দুর্বল দাবি। এই মামলা আদালতে গেলে কুলসুম বেগমের পক্ষেই রায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন, একজন আসামির নামে মামলা থাকলেই কি তার পরিবারের জীবিকা ধ্বংস করে দেওয়া যায়?
তাদের দাবি, ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত, জব্দকৃত গরুর মৃত্যুর দায় নির্ণয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা সহ যে পুলিশ কর্মকর্তা আইনের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হলো, তার বিচার কামনা করছে।


















