
মোঃ আব্দুল হক লিটনঃ
হালুয়াঘাটে জব্দ হওয়া ৮টি গরু অবশেষে ফিরছে তাদের দাবি করা প্রকৃত মালিক পরিবারের হাতে, দীর্ঘ ছয় মাসের সংগ্রাম, অশ্রু, অসহায়ত্ব আর আইনি লড়াই শেষে। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে মালিকানাকে “সৃজিত” বলা হলেও আদালত মানবিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সেই মত গ্রহণ করেননি। বরং নিম্ন আদালতের আদেশ বাতিল করে রিভিশন মঞ্জুর করেছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার গাজীর ভিটা ইউনিয়নের লামুক্তা গ্রামে, যেখানে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করতে গিয়ে জব্দ করা হয় ১০টি গরু। গ্রামের বাড়িতেই বসবাস করেন গ্রেফতারকৃত আব্দুল কাইয়ুম ও তার পরিবার।
চলতি বছরের ৬ জুন, হালুয়াঘাট থানা পুলিশের এসআই শুভ্র সাহা গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করতে লামুক্তা গ্রামের আব্দুল কাইয়ুমের বাড়িতে প্রবেশ করেন। এ সময় ঘরে থাকা ১০টি গরু জব্দ করে থানায় নিয়ে যান। পরদিন ৪১৩/৪১১ ধারায় মামলা রুজু করা হয়।
জব্দ তালিকার ১০টি গরুর মধ্যে ৮টির মালিকানা দাবি করেন কাইয়ুমের বাবা জসিম উদ্দিন ও মেয়ে লামিয়া আক্তার। তারা আদালতে জিম্মায় পাওয়ার আবেদন করেন। এবং জমা দেন, গরুর বর্ণনা, ক্রয় রশিদ, এফিডেভিট সহ মালিকানা প্রমাণের অন্যান্য কাগজপত্র।
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রতিবেদনে লেখেন,এসব কাগজ “সৃজিত” বা তৈরি করা।
কিন্তু নথি পর্যালোচনায় আদালতের নজরে আসে, কোথাও গরুগুলোকে চোরাই বলা হয়নি। পুলিশ ছয় মাসেও চূড়ান্ত রিপোর্ট দিতে পারেনি। মামলা রুজুর পরও অন্য কেউ মালিকানা দাবি করেনি। গরুগুলো দীর্ঘদিন ধরে জিম্মায় থেকে ভুগছে, মৃত্যু ও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় আদালত মনে করেন, পরিবার যে দস্তাবেজ জমা দিয়েছে, তা তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগে বাতিল করার মতো যথেষ্ট কারণ নেই।
আসামি পক্ষে আইনজীবী এডভোকেট মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, ৯ অক্টোবর ফার্স্ট অ্যাডিশনাল দায়রা জজ মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ মানবিক বিবেচনায় রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।
গত বৃহস্পতিবার সকালে জব্দ তালিকায় উল্লিখিত মূল্যের বন্ড দাখিল সাপেক্ষে জসিম উদ্দিন ও লামিয়া আক্তারের কাছে ৮টি গরু জিম্মায় দেওয়া হবে আদেশ দেওয়া হয়। মৃত গরুর ক্ষতিপূরণ সহ আরো দুইটি গরু পাইতে প্রক্রিয়া চলছে বলেও তিনি জানান।
আদেশে আরো উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে যদি গরুর প্রকৃত মালিকানা নিয়ে কোন নতুন প্রমাণ আসে বা চোরাই বলে প্রমাণিত হয়,তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদালতের রায় শোনার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন কাইয়ুমের স্ত্রী কুলসুম, বৃদ্ধ বাবা জসিম উদ্দিন, মা এবং কন্যাসহ পরিবারে অন্যান্য সদস্যরা।
তারা বলেন, আমরা কারও ক্ষতি চাইনি। শুধু আমাদের নিজের গরুগুলো ফেরত চেয়েছি। আদালত আমাদের বাঁচালেন। লামুক্তা গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে গরুগুলো জিম্মায় পড়ে থাকার কারণে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ অব্যবস্থাপনায় দুইটি গরুর মৃত্যু হয়েছে আরেকটি মৃত্যুর সয্যায় শরীর পচে গেছে প্রক্রিয়া ঠুকরে ঠুকরে মাংস খাচ্ছে। খাদ্যের তীব্র সংকটে ও দীর্ঘদিন গরু আটকে রেখে পরিবারের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে।
তারা জানিয়েছেন, পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে তারা লিখিত অভিযোগ দেবেন পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রয়োজন হলে আদালতেরও দ্বারস্থ হবেন।
গাজীর ভিটা ইউনিয়নের লামুক্তা গ্রামে মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তারা জানান, তদন্তে বিলম্ব, অব্যবস্থাপনা এবং সন্দেহজনক প্রতিবেদনের কারণে পুরো ঘটনা জটিল হয়েছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে এমন হয়রানি ভবিষ্যতেও বাড়তে পারে।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের গরু ফেরত পাওয়ার গল্প নয়, এটি আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা, পুলিশের তদন্ত ব্যবস্থার ত্রুটি এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। আদালত যে মানবিক ও বিচারসঙ্গত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা গ্রামীণ সমাজে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করবে।






















