
শিবলী সাদিক খানঃ
জনতা ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন—এমন অভিযোগ দিন দিন আরও প্রবল হচ্ছে। বহু বছর ধরে যারা নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে আসছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই এখনো প্রথম বা দ্বিতীয় গ্রেডেই আটকে আছেন, যেখানে একই ব্যাচের অনেকেই জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) পদেও পৌঁছে গেছেন।
১৯৯৮ সালে একই ব্যাচে যারা সিনিয়র অফিসার (৯ম গ্রেড) পদে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের অনেকে ইতোমধ্যে ডিজিএম বা জিএম পদে উন্নীত হয়েছেন। অথচ একই ব্যাচে অফিসার (১০ম গ্রেড) পদে যোগ দেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ এখনো এসডিও (সিনিয়র ডেভেলপমেন্ট অফিসার) পদেই রয়ে গেছেন। যদিও উভয় শ্রেণির কর্মকর্তারাই অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতার দিক থেকে প্রায় সমান; কিন্তু শুধুমাত্র যোগদানের সময়কার গ্রেডের ভিন্নতার কারণে একপক্ষ পিছিয়ে পড়েছে পদোন্নতির প্রতিযোগিতায়।
২০০৮-০৯ ব্যাচের ক্ষেত্রেও একই বৈষম্য প্রকট। সিনিয়র অফিসাররা ইতোমধ্যে তিন ধাপে পদোন্নতি পেয়ে জিএম হয়েছেন, অনেকে বিজিএম পদের জন্য বিবেচিত হচ্ছেন। অথচ একই বছরের অফিসার পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা কেউ কেউ মাত্র একটি পদোন্নতিই পেয়েছেন, অনেকেই এখনো সিনিয়র অফিসার হতে পারেননি। এ বৈষম্য জনতা ব্যাংকের পদোন্নতি নীতিমালার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, মেধা, সততা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন না করে রাজনৈতিক চাপ, প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়ে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামলে এই ধারা প্রকট ছিল, যা এখনো কিছু প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে বহাল রয়েছে।
সম্প্রতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের জন্য একটি প্রস্তাবিত পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়ন করে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করে। এ নীতিমালায় অধিকাংশ কর্মকর্তা উপকৃত হবেন বলে প্রত্যাশা করা হলেও, একটি অসাধু মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পদোন্নতি প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই চক্রান্তে অংশ নিচ্ছেন তারাই, যারা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে বারবার পদোন্নতি পেয়েছেন।
ব্যাংকের বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, “আমরা ব্যাংককে ভালোবেসে বছরের পর বছর ধরে সৎভাবে কাজ করেছি। অথচ আজ আমরা পেছনে পড়ে আছি—এ কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমাদের জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টা কেটেছে অপেক্ষায়, কিন্তু কোনো স্বীকৃতি নেই।”
তারা আরও জানান, “আমরা চাই ন্যায্যতা, সম্মান ও স্বচ্ছ পদোন্নতি নীতি। কোনো পক্ষপাত, রাজনীতি বা অনৈতিক সুবিধাভোগীর দৌরাত্ম্য নয়। আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দিন।”
মতিঝিলের ব্যাংকপাড়ায় কথা বলে জানা গেছে, এই পদোন্নতিবঞ্চনার কারণে শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা যখন পিছিয়ে থাকেন, তখন তাঁদের মনোবল ভেঙে পড়ে—এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যাংকের সার্বিক কর্মদক্ষতায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা, পেশাদারিত্ব ও কর্মীদের আস্থাবোধ ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পদোন্নতি নীতিমালা অত্যন্ত জরুরি। আর তা কার্যকর করতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নজরদারি এবং সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন।
জনতা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংকট শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়, এটি সমগ্র রাষ্ট্রীয় ব্যাংক খাতের প্রতিচ্ছবি। তাই এই সংকট নিরসনে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ, বিদ্বেষমূলক আচরণ বন্ধ এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন ব্যাংকের বঞ্চিত কর্মকর্তারা।

















