
মোঃ আব্দুল হক লিটনঃ
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এখন যেন সীমান্তবর্তী নয়, যেন একটি অঘোষিত মাদকপ্রদেশ। ভারতের মেঘালয় রাজ্য ঘেঁষা সীমান্তের ১ নম্বর ভুবনকুড়া ও গাজিরভিটা ইউনিয়ন দিয়ে প্রতিনিয়ত গোপনে ঢুকছে মাদকদ্রব্য ও ভারতীয় পণ্য। আর এই পাচারের ফলে, গোটা হালুয়াঘাট উপজেলায় তৈরি হয়েছে এক গভীর অন্ধকার জগৎ—যেখানে শিশুরা বইয়ের বদলে ধরছে গাঁজার প্যাকেট, আর কিশোররা স্বপ্নের বদলে বেছে নিচ্ছে নেশার অবাধ জগৎ।
পুলিশ ও বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়তই মাদক প্রবেশ করাচ্ছে বাংলাদেশে। প্রশাসনের দৃষ্টি এড়িয়ে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে এখন মাদক সরবরাহ হচ্ছে প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতে। শুধু গ্রাম নয়, পৌর শহরের অলিগলি, বাজার, স্কুল এলাকা—সবখানেই প্রকাশ্যে চলছে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদকের ব্যবসা ও সেবন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। হালুয়াঘাট পৌর শহরের উত্তরবাজার, কড়ইতলী স্থলবন্দর, শাপলা বাজার, কয়লার ডিপু, কড়ইতলী চিনির মোড়, নড়াইল, কুমুরিয়া, গাবরাখালী, হাইস্কুল মাঠের চারপাশ, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের পাশে, পাগলপাড়া, চন্দনের রাইস মিল, বোর্ডবাজার, হাদিসের মোড়, জালালের মোড়, সংরা বাজার, নতুন বাস স্ট্যান্ড, বড়দাসপাড়া রোড এবং নদীপাড়ে সন্ধ্যার পর গড়ে ওঠে ‘মাদকের হাট’। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে এই মাদকবাজার। ঝড়-বৃষ্টিও যেন বাঁধা হতে পারে না তাদের নেশা ও ব্যবসার।
এই বিপজ্জনক প্রবণতা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। স্কুল ফাঁকি দিয়ে মাদক সেবনে লিপ্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররাও। চোখে স্বপ্ন থাকা যাদের, সেই স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্ররাই আজ নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে মাদকের গহ্বরে।
প্রবীণ অভিভাবক আবুল কাশেম বলেন, “আমার ছেলে অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সারাদিন গেম আর টিকটকে বুঁদ। টাকা কোথায় পায় জিজ্ঞেস করলে বলে বন্ধুদের কাছ থেকে। আমি বারণ করলে বলে, তুমি কিছু বোঝো না। ও ভুলেই গেছে আমি তার বাবা।” কথার শেষে তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “পুলিশ যদি চুপ থাকে, আমরা সন্তান মানুষ করব কীভাবে?”
নাজিম উদ্দিন আহমেদ, আরেক অভিভাবক জানালেন, “আমার ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর দেরি করে আসে। একদিন খোঁজ নিয়ে দেখি, সানফ্লাওয়ার স্কুলের পাশে নদীর পাড়ে বড়ই গাছের নিচে বন্ধুবান্ধব মিলে গাঁজা খাচ্ছে। আমি গেলে সবাই দৌড়ে পালায়। ছেলেকে শাসন করলেও পরদিন আবার একই অবস্থা। সন্তানদের মানুষ করব, নাকি সমাজ থেকে বাঁচবো!
এদিকে মাদক ব্যবসায়ী আবুল কাশেম (ছদ্মনাম) বলেন, মাদক ব্যবসার লাভজনক দিক দেখে এখন নারী ও বৃদ্ধরাও জড়িয়ে পড়েছেন। ৫০-৫৫ বছর বয়সী নারী-পুরুষরা এই চক্রের অংশ হয়ে উঠেছে। কেননা, পুলিশ এসব বয়সী মানুষকে সাধারণত সন্দেহ করে না। নারীরা এখন এই ব্যবসায় ‘অগ্রভাগের সৈনিক’ হিসেবে কাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক নেতা জানান, “সন্ধ্যা নামতেই বাসস্ট্যান্ড এলাকা রূপ নেয় মাদকের আস্তানায়। আশপাশের গারো ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাসের সুযোগে এখানে প্রকাশ্যেই গাঁজা ও ইয়াবার জমজমাট ব্যবসা চলছে। মাঝে মধ্যে পুলিশ এলেও কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায় না। এমনকি বাসস্ট্যান্ডের আশেপাশে কিছু উপজাতি ও পশ্চিমা জনগোষ্ঠীর লোকজন প্রকাশ্যে সিরিয়াল ধরে মাদক বিক্রি করে। তাদের কথায়, এটি নাকি তাদের ‘ঐতিহ্য’।”
গাড়িচালকের স্ত্রী আফরোজা বেগম (ছদ্মনাম) বলেন,
“আমার স্বামী সারাদিন গাড়ি চালায়, কিন্তু রাতে খালি হাতে বাড়ি ফেরে। দিনের পর দিন রোজগারের সবটাই নেশায় উড়িয়ে দেয়। ঘরে ফিরে একমুঠো চালও এনে দেয় না। আমি আর আমার সন্তানরা না খেয়ে তার পথ চেয়ে বসে থাকি। এমনও দিন গেছে—সারাদিন না খেয়ে সন্তানদের কোলের কান্না শুনেছি। কিছু বললেই শুরু হয় মারধর। ঘরের ভেতরেও শান্তি নেই, ভাতের হাঁড়িতেও আগুন জ্বলে না। শুধু ভাবি, কবে শেষ হবে এই নেশার দুনিয়া? কবে আবার দুমুঠো ভাত মুখে তুলে শান্তিতে সন্তানদের মানুষ করতে পারব?”
স্থানীয় কলেজ শিক্ষক সুলতান আহমেদ বলেন,
“হালুয়াঘাটে এখন হাত বাড়ালেই মাদক। স্কুল-কলেজের ছাত্ররাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ কেউ তো নেশার পাশাপাশি এখন ব্যবসাতেও জড়িয়ে পড়েছে। এতদিন বলা হতো—মাদক যুবসমাজকে ধ্বংস করে, এখন তা শিশুদেরও গিলে খাচ্ছে। বইয়ের ব্যাগে আজ মাদকের প্যাকেট, শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতির তালিকায় বাড়ছে কিশোর মুখ। এই প্রজন্ম যদি না বাঁচে, তাহলে ভবিষ্যৎ রক্ষা করবে কে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কঠোর হওয়া এখন সময়ের দাবি।
নাগরিক আন্দোলনের নেতারা বলছেন, হালুয়াঘাটে যেভাবে মাদক সেবন, ক্রয়-বিক্রয় ও বিস্তার বেড়ে চলেছে, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে তা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দরকার একটি সর্বস্তরের সমন্বিত উদ্যোগ।
তারা প্রস্তাব করছেন—উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, এমনকি পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে গঠন করতে হবে অন্তত ১০১ সদস্যবিশিষ্ট মাদক প্রতিরোধ কমিটি। এই কমিটিকে কেবল প্রতীকী রাখলেই হবে না, তাদেরকে দিতে হবে বাস্তবভিত্তিক ক্ষমতা।
যেখানেই মাদকের কেনাবেচা বা সেবনের খবর পাওয়া যাবে, সেখানেই তারা হস্তক্ষেপ করতে পারবে। নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ধরে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে—জেল হোক কিংবা জরিমানা।
তবেই হালুয়াঘাট বদলাবে। তবেই এই সমাজ রক্ষা পাবে মাদকের অভিশাপ থেকে। বাঁচবে আমাদের শিশু-কিশোর, যুবক ও আগামীর প্রজন্ম।
হালুয়াঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি। প্রতিদিনই মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।” তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব অভিযান লোক দেখানো। সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিযানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
হালুয়াঘাটে এখন যুদ্ধে নেমেছে দুটি পক্ষ—একদিকে ধ্বংসের হাতছানি, অন্যদিকে সমাজ রক্ষার প্রয়াস। প্রশাসনের আরও সক্রিয়তা, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এই মরণছোবল থামানো অসম্ভব। নইলে হালুয়াঘাট নামটি হয়তো ভবিষ্যতে পরিচিত হবে “হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের জনপদ” হিসেবে
মোঃ আব্দুল হক লিটন
হালুয়াঘাট ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
০১৭১৪৫৮১৮৮
















